ডেইলি খবর ডেস্ক:বাংলাদেশে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ অন্যদের দীর্ঘদিন বিনাবিচারে আটক রাখা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
রবিবার (২৩ আগস্ট)এইচআরডব্লিউ প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেককে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই দীর্ঘ সময় কারাগারে রাখা হয়েছে।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বয়োবৃদ্ধ ও গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিও রয়েছেন। যাঁরা পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও জামিনের সুযোগ পাচ্ছেন না।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে গণবিক্ষোভের মুখে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করার পর আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মী, সমর্থক ও কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর প্রায় দুই বছর পরও শত শত ব্যক্তি কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই কারাগারে রয়েছেন।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, শেখ হাসিনা সরকারের কিছু কর্মকর্তা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। তবে বর্তমানে অনেককে আন্দোলনকারীদের হত্যার অভিযোগে স্পষ্ট প্রমাণ ছাড়াই গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আটক ব্যক্তিদের পরিবার ও আইনজীবীরা তাঁদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ করেছেন।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তত ১০ জন আওয়ামী লীগ নেতা কারাগারে মারা গেছেন।
তাঁদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়নি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ইলেইন পিয়ারসন বলেন, ‘বাংলাদেশে একের পর এক সরকারের আমলে শত শত বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীকে কোনো প্রমাণ বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বন্দি করে রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক রাখা বন্ধ করাকে সংস্কারের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখতে হবে।’
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বিচারিক কার্যক্রম নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এইচআরডব্লিউ। সংস্থাটি বলেছে, কোনো কোনো মামলায় প্রমাণ উপস্থাপন করা সম্ভব না হলেও সরকারি কৌঁসুলিরা বারবার জামিন বাতিলের আবেদন করছেন।
নিম্ন আদালতে জামিন না মিললেও উচ্চ আদালত জামিন দিলে পুলিশ নতুন মামলা দিয়ে মুক্তির পথ আটকে দিচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে ৮২ বছর বয়সী সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের কথা উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তাঁকে এক বিক্ষোভকারীকে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ আরও কয়েকটি মামলা করা হয়। হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ হলেও বিভিন্ন সময় তাঁর জামিন আবেদন নাকচ হয়। পরে হাইকোর্ট জামিন দিলেও নতুন মামলা দিয়ে তাঁকে আটক রাখা হয়। এক বছরের বেশি সময় বন্দি থাকার পর গত ১৯ আগস্ট আপিল বিভাগের হস্তক্ষেপে তিনি জামিনে মুক্তি পান। এ সময়ের মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ।
বর্তমান সরকারের প্রস্তাবিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ। সংস্থাটির আশঙ্কা, খসড়াটি বর্তমান রূপে পাস হলে নতুন মানবাধিকার কমিশন স্বেচ্ছাচারী গ্রেপ্তারের অভিযোগ তদন্তে বাধার মুখে পড়বে।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য, সাবেক আইনপ্রণেতা, সমাজকর্মী, সরকারি কর্মকর্তা ও আওয়ামী লীগ সমর্থক সাংবাদিক রয়েছেন। নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েকজন সদস্যও আটক আছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন, গুম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে এইচআরডব্লিউ। সংস্থাটি বলেছে, বিশেষ ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি’ উল্লেখ করে অভিযোগ গঠনের আগে কাউকে এক বছরের বেশি সময় আটক রাখা সম্ভব হলেও ট্রাইব্যুনালে আটক ১৬০ জনের বেশি ব্যক্তির কেউ জামিন পাননি।
সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ৮১ বছর বয়সী ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ২২ মাস ধরে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই আটক রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে সাবেক সংসদ সদস্য ৭৫ বছর বয়সী কামাল আহমেদ মজুমদারও ২২ মাস ধরে আটক। কারাগারে তাঁর পায়ে গ্যাংগ্রিন হওয়ায় তিনটি আঙুল কেটে ফেলতে হয়েছে। পড়ে গিয়ে তাঁর কোমরের হাড়ও ভেঙেছে। এরপরও গত জুলাইয়ে তাঁর জামিন আবেদন নাকচ হয়।
আটক ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর অভিযোগ, গুরুতর অসুস্থ বন্দিরাও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না। ৭৫ বছর বয়সী শাহরিয়ার কবির দীর্ঘদিনের শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন এবং হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন। ৭১ বছর বয়সী র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী হৃদরোগে আক্রান্ত অবস্থায় ২২ মাস ধরে আটক রয়েছেন।
বন্দি অবস্থায় মৃত্যুর ঘটনাও তুলে ধরেছে এইচআরডব্লিউ। সাবেক সংসদ সদস্য ৮৫ বছর বয়সী রমেশ চন্দ্র সেন ২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কারাগারে মারা যান। জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ৬৫ বছর বয়সী এস এম জিয়াউল হক জিয়াও চিকিৎসার অভাবে গত ১৪ এপ্রিল কারাগারে মারা যান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে বিচারের আগে আটক রাখা ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা হওয়া উচিত। প্রতিটি বন্দির আটকের বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তা বিচারকের মাধ্যমে পৃথকভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। দ্রুত বিচার অথবা মুক্তির অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।
সংস্থাটি বর্তমান সরকারের আমলে হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনা স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত এবং কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দীর্ঘদিন আটক রাখার প্রবণতা অবিলম্বে বন্ধ করার সুপারিশ করেছে।ফাইল ছবি

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :