বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট, ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩

জুলাই তথ্যচিত্র নিয়ে বিতর্ক-হট্টগোল অনুষ্টান থেকে বেরিয়ে গেলেন এনসিপি নেতারা

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ৫, ২০২৬, ০৯:২০ পিএম

জুলাই তথ্যচিত্র নিয়ে বিতর্ক-হট্টগোল অনুষ্টান থেকে বেরিয়ে গেলেন এনসিপি নেতারা

ডেইলি খবর প্রতিবেদক: দেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানের তথ্যচিত্রে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রথম প্রতীকী শহীদ আবু সাঈদ না থাকায় একদিকে যেমন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে তেমনি এর প্রতিবাদে তুমুল হট্টগোলের ঘটনা ঘটে।

বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা’ শিরোনামে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। অনুষ্ঠানে হট্টগোল ও উত্তেজনার ঘটনায় অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে বেরিয়ে যান ঢাকায় কর্মরত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় জুলাই আন্দোলনের ওপর একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। তথ্যচিত্রটি শেষ হওয়ার পরপরই দর্শক সারিতে থাকা জুলাই আন্দোলনে আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের একাংশ ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দিয়ে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন। তাদের অভিযোগ, তথ্যচিত্রে আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বাদ পড়েছে এবং অসংগতি রয়েছে। বিশেষ করে ৩ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ সেখানে অনুপস্থিত ছিল। অর্থাৎ তথ্যচিত্রে শহীদ আবু সাঈদের অনুপস্থিতি, ১ দফা ঘোষণা, ৯ দফা–সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বিক্ষুব্ধদের আপত্তি ছিল।

বিক্ষুব্ধদের অভিযোগ, অনুষ্ঠানে প্রচারিত তথ্যচিত্র বা ডকুমেন্টারিতে জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়নি। এটা নিয়ে শুরুতে বাগবিতণ্ডা আর স্লোগান দিতে থাকেন তারা। এসময় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন ধমকের সুরে সবাইকে থামতে বলেন। এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ এনসিপি নেতারা অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন। হট্টগোলের একপর্যায়ে কূটনীতিকরাও বেরিয়ে যান। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক মাহিন সরকার অনুষ্ঠানে ছিলেন। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, তথ্যচিত্রে ১ দফার ঘোষক বানানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে। যে নাহিদ ইসলাম (এনসিপির আহ্বায়ক) নিজের মৃত্যু পরোয়ানায় সই করে ১ দফার ঘোষণা দিলেন, তিনি বিএনপির ইতিহাসে নেই। যে আসিফ মাহমুদ (এনসিপির মুখপাত্র) মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ ঘোষণা করলেন তিনি ইতিহাসে নেই। মাহিন সরকার আরও লিখেছেন, অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত তথ্যচিত্রের প্রতিবাদ করার কারণে প্রধানমন্ত্রীর বাহিনী তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রপতির সামনে তার ওপর হামলা করা হয়েছে।

হট্টগোলের মধ্যে মঞ্চ থেকে অনুষ্ঠানের উপস্থাপক সবাইকে শান্ত হওয়ার জন্য বারবার আহ্বান জানান। তবে হট্টগোল চলছিল। এ পর্যায়ে অনুষ্ঠানের মঞ্চে ওঠেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। তিনি বলেন, ‘আমি সকলকে শান্ত হওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।’ একই সঙ্গে তথ্যচিত্রে কোনো ভুল থাকলে তা সংশোধনের কথাও বলেন তিনি। অবশ্য তখনো দর্শকসারি থেকে ‘আমাদের নিয়ে তালবাহানা করা চলবে না’সহ নানা স্লোগান দেওয়া হয়। মন্ত্রীকেও দেখা যায় বারবার অনুরোধ করতে।

অনুষ্ঠানে শৃঙ্খলা না আসায় মাইকের সামনে আসেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। তিনি অনেকটা ধমকের সুরে বলেন, ‘আপনারা কী নিজেদের জাহির করার জন্য আসছেন?’

যারা স্লোগান দিচ্ছিলেন, তাঁদের উদ্দেশে ইশরাক হোসেন আরও বলেন, ‘কী করছেন আপনারা? আপনারা শহীদ পরিবারদের জন্য কী করেছেন? কিছুই করেন নাই আপনারা।’

এ সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মাইকের সামনে আসেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের মধ্য থেকে যারা বক্তব্য দিতে চান, দয়া করে আপনারা এখানে এসে কথা বলুন। আপনাদের বক্তব্য আপনারা বলুন, আমরা শুনব। কিন্তু শান্তশিষ্টভাবে বসুন দয়া করে।’

তথ্যচিত্রে জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা সঠিকভাবে তুলে না ধরার অভিযোগ তোলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। এক পর্যায়ে অনুষ্ঠানস্থল থেকে বেরিয়ে যান তাঁরা।

অনুষ্ঠানস্থল ছাড়ল এনসিপি

কথা বলার মাঝে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনকে কয়েক বার ডাকেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কিছুক্ষণ পরে মঞ্চে আসেন আখতার হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমি জুলাই যোদ্ধাদের একজন হয়ে এবং আমার দলের একজন প্রতিনিধি হিসেবে এই অনুষ্ঠানের সফলতা কামনা করি; কিন্তু আমার ব্যক্তিগত পক্ষে এবং আমার যে সহযোদ্ধারা আছেন, তাদের জন্য একটি সুন্দরের আকাঙ্ক্ষায় আমার পক্ষে এই অনুষ্ঠানে অবস্থান করা সম্ভবপর নয়।’

আখতার আরও বলেন, ‘আমি আজকের এই অনুষ্ঠানের রাষ্ট্রপতি, তাকে আমি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি। তিনি বাংলাদেশের পক্ষে যেভাবে অবস্থান নিয়েছেন, সেটাকে আমরা ধারণ করি। তিনি একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা, একই সঙ্গে জুলাই যোদ্ধা, তার প্রতি সম্মান ব্যক্ত করছি। সেই সম্মান রেখে আমি নীরবে এখান থেকে প্রস্থান করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম।’

মঞ্চ ছাড়ার আগে এনসিপির সদস্যসচিব বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় একটি অনুষ্ঠানেও আমরা ইতিহাসের সবকিছুকে আমরা ধারণ করতে ব্যর্থ হলাম। আপনারা খেয়াল করে দেখবেন, এই বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে যেমন একপেশেভাবে আওয়ামী লীগ দখল করেছিল; ঠিক একই ধরনের একটা পরিস্থিতি এখানে তৈরি হয়েছে।’

আখতার হোসেন অভিযোগ করেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যচিত্রে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ৯ দফার কথা উল্লেখ করা হয়নি। ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট শহীদ মিনারে যে এক দফার ঘোষণা দেওয়া হলো, সে বিষয়টাও নেই।

জুলাই আন্দোলনের ওপর নির্মিত তথ্যচিত্রের প্রতিবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানস্থল থেকে বেরিয়ে যান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা।

‘আমি ব্যথিত’, বললেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি

অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ভুলত্রুটি মানুষের হতেই পারে। সবাই মিলে সেসব ভুল সংশোধন করতে হবে। তবে জাতীয় অনুষ্ঠানে বিদেশিদের সামনে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে তিনি গভীরভাবে ব্যথিত ও মর্মাহত হয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এইভাবে যে বিদেশের সামনে, বিদেশি অতিথিদের সামনে যে নাস্তানাবুদ হলাম, এটি আমাকে খুবই ব্যথিত করেছে। এবং এই ঘটনায় সবচেয়ে খুশি হবে যিনি পাশের দেশে বসে আছেন, তার জন্য অত্যন্ত আনন্দের একটি দিন।’

অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত তথ্যচিত্রে ভুলের সমালোচনা করে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, সেখানে শহীদ আবু সাঈদের ছবি ছিল না। অথচ আবু সাঈদ জুলাই বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি ও প্রতীক। তার ছবি ছাড়া ওই আন্দোলনের কোনো তথ্যচিত্র পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছবিও তথ্যচিত্রে ছিল না বলে উল্লেখ করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি।

এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ নিজের বক্তব্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ‘দলীয়করণ করা যাবে না’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি বলি জুলাই কার? জুলাই কার? তাহলে জুলাই আমাদের কারোর থাকবে না। এই অবস্থা থেকে আমাদের মুক্তি পেতে হবে।’সংগৃহীত ছবি

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!