শনিবার, ০১ আগস্ট, ২০২৬, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩

দেশে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পেট্রোবাংলার

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ৩১, ২০২৬, ১২:২৩ পিএম

দেশে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পেট্রোবাংলার

ডেইলি খবর ডেস্ক: এবার ভর্তুকির চাপ কমাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও যানবাহনে ব্যবহৃত সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাসের (সিএনজি) দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে পেট্রোবাংলা। সংস্থাটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ১৬ টাকা থেকে ২৫ টাকা এবং সিএনজির দাম ৪৩ টাকা থেকে প্রায় ৬৫ টাকা করার প্রস্তাব জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে পাঠিয়েছে। গ্যাস বিতরণকারী কোম্পানিগুলোও বিতরণ মাশুল বাড়ানোর আবেদন করেছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং ভর্তুকির চাপ সামাল দিতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পেট্রোবাংলার প্রস্তাব বর্তমানে পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে এটি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে পাঠানো হবে। এরপর কমিশন গণশুনানি করবে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের মতামত ও আর্থিক বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করে গ্যাসের নতুন দাম নির্ধারণ করবে।

বর্তমান আইনে দেশে গ্যাসের দাম নির্ধারণ ও পরিবর্তনের দায়িত্ব বিইআরসির। পেট্রোবাংলা কিংবা গ্যাস বিতরণ কোম্পানির প্রস্তাব সরাসরি কার্যকর হয় না। কমিশনের অনুমোদনের পরই নতুন দাম কার্যকর করা হয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আপাতত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সিএনজি খাতের গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আবাসিক, বাণিজ্যিক বা বিদ্যমান শিল্প গ্রাহকদের জন্য নতুন করে দাম বাড়ানোর কোনো প্রস্তাব এখন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। এর আগে ২০২৫ সালের এপ্রিলে নতুন শিল্পে গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ৩০ টাকা থেকে ৪০ টাকা এবং একই বছরের নভেম্বরে সার কারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ১৬ টাকা থেকে ২৯ দশমিক ২৫ টাকা করা হয়েছিল।

এদিকে গ্যাসের দামের পাশাপাশি বিতরণ মাশুলও বাড়াতে চায় বিতরণ কোম্পানিগুলো। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি বর্তমান ৩৭ পয়সার পরিবর্তে ১ টাকা ২১ পয়সা, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি ২৪ পয়সা থেকে ৪১ পয়সা, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ৩০ পয়সা থেকে ৯০ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি দুটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে। অনুমোদিত সিস্টেম লস ৫ শতাংশ ধরা হলে প্রতি ঘনমিটারে ৩৫ পয়সা এবং ২ শতাংশ হলে ১ টাকা ৪ পয়সা বিতরণ চার্জ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেড ১৮ পয়সা থেকে ৬৩ পয়সা এবং সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড ২৪ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫ পয়সা করার আবেদন করেছে।

বিতরণ কোম্পানিগুলোর দাবি, বর্তমান মাশুল দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। অনেক প্রতিষ্ঠান অপরিচালন আয় দিয়ে কোনোভাবে টিকে আছে। লোকসান অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ‘আমরা বিষয়টি শুনেছি। তবে আমাদের কাছে এখনও প্রস্তাব আসেনি। প্রস্তাব এলে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়ার কারণে গ্যাস সংগ্রহে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন উৎস থেকে কেনা গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য ছিল প্রতি ঘনমিটার ৩১ দশমিক ৬৫ টাকা। বিপরীতে গড় বিক্রয়মূল্য ছিল ২৩ দশমিক ৬৩ টাকা। ফলে প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ৮ দশমিক শূন্য ২ টাকা ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

সংস্থাটির হিসাবে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে অস্থিরতার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ঘনমিটারে গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য ছিল ২৭ দশমিক ৬৪ টাকা। কিন্তু এপ্রিল থেকে জুন সময়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৫ দশমিক ৭৯ টাকায়। ওই তিন মাস আগের বিক্রয়মূল্যে গ্যাস সরবরাহ করায় প্রতি ঘনমিটারে ঘাটতি বেড়ে হয় ২১ দশমিক ৮২ টাকা। এতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেট্রোবাংলার মোট আর্থিক ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বিপরীতে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
দেশি ও বিদেশি–উভয় উৎস থেকেই গ্যাস সংগ্রহ করে পেট্রোবাংলা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি ও বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি থেকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস কেনা হয় ১ টাকায় এবং বাপেক্স থেকে ৪ টাকায়। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান শেভরন বাংলাদেশ থেকে প্রতি হাজার ঘনফুট ২ দশমিক ৭৬ ডলার এবং আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানি তাল্লো থেকে ২ দশমিক ৩১ ডলার দরে গ্যাস কেনা হয়। অন্যদিকে কাতার থেকে আমদানি করা এলএনজির দাম প্রতি হাজার ঘনফুট ১০ দশমিক ৬৬ ডলার এবং ওমান থেকে আমদানি করা এলএনজির দাম ১০ দশমিক ৯ ডলারের কাছাকাছি। ফলে দেশীয় গ্যাসের তুলনায় আমদানি করা এলএনজির ব্যয় কয়েক গুণ বেশি।

একসময় দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ২৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন হলেও মজুত কমে যাওয়ায় তা এখন প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। গত অর্থবছরে মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৩০ শতাংশ এসেছে আমদানির মাধ্যমে এবং ৭০ শতাংশ দেশীয় উৎস থেকে। তবে পেট্রোবাংলার পূর্বাভাস, ২০৩০ সালের মধ্যে এই চিত্র উল্টে যেতে পারে। তখন দেশের মোট গ্যাসের প্রায় ৭০ শতাংশই আমদানি করতে হবে এবং দেশীয় উৎসের অবদান নেমে আসবে ৩০ শতাংশে।

জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে ৩০ শতাংশ আমদানি করা গ্যাসের কারণেই গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। ভবিষ্যতে আমদানি নির্ভরতা ৭০ শতাংশে পৌঁছালে এই চাপ আরও বাড়বে। সে কারণে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান কার্যক্রম না হওয়ায় দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। ১৯৯৫ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে প্রতিবছর অন্তত চারটি অনুসন্ধান কূপ খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও কোনো সরকারই তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ফলে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের গতি কমে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নতুন গ্যাস সংযোগে। বর্তমানে নতুন শিল্পে গ্যাস সংযোগ প্রায় বন্ধ। বিদ্যমান অনেক শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রও প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ না বাড়িয়ে শুধু আমদানিনির্ভরতা বাড়ানো হলে ভবিষ্যতে গ্যাসের দাম ও ভর্তুকির চাপ আরও বাড়বে।সুত্র-সমকাল

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!