ডেইলি খবর ডেস্ক: কালো টাকা সাদা করার তাগিদ আসছে! আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকতে পারে। দেশের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার এবং বিনিয়োগ বাড়াতে কালো টাকা অর্থনীতির মূল ধারায় যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যদিও বিগত সময়ের পরিসংখ্যান বলছে, এমন সুযোগ থেকে অর্থনীতিতে খুব বেশি সুফল মেলেনি। তা সত্ত্বেও প্রতিবছর জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি ও বাণিজ্যিক স্পেস ক্রয়-বিক্রয়ে প্রকৃত লেনদেন গোপন করা এবং কম দামে দলিল করার কারণে হাজার হাজার কোটি টাকার কালো অর্থ তৈরি হচ্ছে। মূলত রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের গ্যাঁড়াকল ও মৌজা মূল্যের ফাঁদে তৈরি হওয়া এই অর্থ মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শর্ত সাপেক্ষে বিশেষ সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার।
জানা গেছে, এবারের সুযোগটি আগের মতো ঢালাও হবে না। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, জমি বা ফ্ল্যাট কেনাবেচার ক্ষেত্রে প্রকৃত মূল্য বৈধ করতে হলে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষকে তাদের আয়কর রিটার্নে সম্পদের প্রকৃত মূল্যের ঘোষণা দিতে হবে।
এ বিষয়ে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল বলেন, ‘নৈতিকতার দিক থেকে বিবেচনা করলে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়তো পুরোপুরি সমর্থনযোগ্য নয়। তবে বাস্তবতার নিরিখে আমাদের ভাবতে হবে- সুযোগ না দিলে এই বিশাল অঙ্কের কালো অর্থ শেষ পর্যন্ত কোথায় যাবে?’
বিগত সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘অতীতে সুযোগের অভাবে দেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। আমরা জানতে পেরেছি, প্রধানমন্ত্রী এই অর্থ দেশে ধরে রাখার বিষয়ে ইতিবাচক উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবছেন। সরকারের পক্ষ থেকে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হলে দেশের টাকা দেশেই থাকবে; অন্যথায় তা আবারও পাচারের ঝুঁকিতে পড়বে।’
আবাসন শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি উল্লেখ করে রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘আবাসন খাত অত্যন্ত নাজুক ও কঠিন সময় পার করছে। এই স্থবিরতা কাটাতে যদি কালো অর্থ আবাসন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তা দেশের অর্থনীতির মূল ধারায় বড় ধরনের ইতিবাচক অবদান রাখবে।’নিট পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমাদের সময়কে বলেন, কালো টাকা সাদা করার ব্যাপারে অতীতেও সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তাতে বেশি সাড়া মেলেনি। অতীতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগে তেমন সাড়া না মিললেও সাম্প্রতিক সময়ে দেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাট হয়েছে, তা অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনা জরুরি। এই অব কালো অর্থ যদি বিশেষ শর্তে বা কর দিয়ে সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তা ব্যাংকিং খাত এবং মূল অর্থনীতিতে যুক্ত হবে। এতে বাজারে তারল্য সংকট কমবে, নতুন বিনিয়োগ বাড়বে এবং প্রকারান্তরে স্থবির হয়ে পড়া দেশের অর্থনীতি আবার গতিশীল হবে। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্বার্থে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনাকরা উচিত।’
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকারের আমলে দেশে এ পর্যন্ত প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি কালো অর্থ বৈধ হয়েছে। করোনা মহামারীর সময়ে মাত্র ১০ শতাংশ কর হারে ঢালাও সুযোগ দেওয়ায় দেশের ইতিহাসে এক বছরে সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৮৩৯ জন ব্যক্তি প্রায় ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সাদা করেছিলেন। এর থেকে এনবিআর ২ হাজার ৬৪ কোটি টাকা রাজস্ব পায়। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭-০৮ ও ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা সাদা করা হয়, যেখানে রেকর্ডসংখ্যক ৩২ হাজার ৫৫৮ জন এই সুযোগ নেন। এরপর ২০০৯-২০২৩ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনকালে এই দীর্ঘ সময়ে সব মিলিয়ে প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা সাদা করা হয়।
পরবর্তী সময় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫ শতাংশ কর হারে এই সুবিধা দেওয়া হলেও অন্তর্র্বতী সরকার দায়মুক্তির বিধান বাতিল করে। বর্তমানে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ কর ও তার ওপর ১০ শতাংশ জরিমানা দিয়ে অর্থ বৈধ করার নিয়ম চালু রয়েছে।সরকারের এই সম্ভাব্য পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন অর্থনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, কালো অর্থ (কালো টাকা) সাদা করার সুযোগ বারবার দেওয়া হলে সৎ করদাতা ও নিয়মিত ব্যবসায়ীরা নিরুৎসাহিত হন। তিনি বলেন, অর্থনীতিতে গতি আনতে সাময়িক সুবিধার বদলে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনরুদ্ধার, নীতি স্থিতিশীলতা, কর ব্যবস্থার সরলীকরণ, বাস্তব অর্থে অটোমেশন এবং বৈধ ব্যবসার জন্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কালো টাকা বৈধ করার সংস্কৃতি দুর্নীতি ও কর ফাঁকিকে উৎসাহিত করে, যা সুস্থ অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। সরকারকে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানিমুখী খাতে প্রণোদনা দিয়ে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলার দিকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, কালো টাকা সাদার সুযোগে সামান্য কিছু রাজস্ব এলেও এটি সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করে। এতে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি। একান্ত সুযোগ দিতে হলে প্রযোজ্য করের পাশাপাশি বড় জরিমানা আরোপ করা উচিত।
অন্যদিকে অর্থনীতিতে গতি আনতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার অংশ হিসেবে ওষুধ, অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই), কৃষি খাতকৃষি যন্ত্রপাতি এবং উৎপাদনমুখী শিল্পসহ ২০টিরও বেশি খাতে নতুন বিনিয়োগের জন্য ‘ট্যাক্স হলিডে’ বা কর অবকাশের আদলে কর ছাড়ের সুবিধা পুনর্বহালের কথাও ভাবছে সরকার।ছবি-সংগৃহীত,সুত্র আমাদের সময়

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :