রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৬, ৩০ ফাল্গুন ১৪৩২

জনগণের আমানতের টাকা ব্যক্তিস্বার্থে খরচের অভিযোগ পিপলস লিজিং এর এমডি সাগীর হোসেনের বিরুদ্ধে

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: মার্চ ১৪, ২০২৬, ০৪:৩১ পিএম

জনগণের আমানতের টাকা ব্যক্তিস্বার্থে খরচের অভিযোগ পিপলস লিজিং এর এমডি সাগীর হোসেনের বিরুদ্ধে

মন্জর-ই-এলাহী শাহীন: বাংলাদেশে বর্তমানে জরাজীর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্য পিপলস লিজিং এন্ড ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড অন্যতম। পি কে হালদার কাণ্ডে আলোচিত পিপলস লিজিং এর প্রায় সাত হাজার আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষার্থে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং কোম্পানি কোর্টের তত্ত্বাবধানে পিপলস লিজিং পরিচালিত হলেও, বর্তমান এমডি এবং বোর্ডের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা এই দুই আইনী সংস্থাকে অনেকটা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর এখনও কিছু ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী এমডি বহাল তবিয়্যতে রয়ে গেছেন, তাদের মধ্যে পিপলস লিজিং এর এমডি সাগীর হোসেন অন্যতম। 

সূত্রমতে জানা যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার ও পিকে হালদারের ঘনিষ্ঠ লোক ছিলেন এই সগীর হোসেন। কুষ্টিয়ায় বাড়ি হওয়ার সুবাদে নিজেকে আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবুল আলম হানিফের আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিতেন বলেও জানা যায়। সূত্র বলছে সরকার পরিবর্তন হলেও একই বোর্ড একই এমডি নিয়ে চলছে প্রতিষ্ঠানটি। জনগণের আমানতের টাকা জনগণকে ফেরত দেওয়ার কর্মকান্ডে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না থাকলেও সেই টাকা ইচ্ছেমতো অপচয় করার অভিযোগ উঠেছে এমডি সাগীর হোসেন ও তার আজ্ঞাবহ কিছু অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এরই ধারাবাহিকতায় পল্টন থানায় দায়েরকৃত জুলাই হত্যা মামলা নং ২৬ তাং ১৬/০৩/২০২৫ এর অন্যতম আসামি পিপলস লিজিং এর এমডি সাগীর হোসেন, কোম্পানি সচিব আরমিয়া ফকির নিজেদের নাম ওই মামলা থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করতে ১০ লক্ষ টাকা ঘুষ প্রদান করেন বলে সূত্রমতে জানা যায়।যে বিষয়টি সেপ্টেম্বর ২২,২০২৫ তারিখের অফিস নোট পিএলএফ/অফিস নোট/এমজি/এফসি/২০২৫ তে পল্টন থানার মামলা নং ২৬, ১৬/৩/২০২৫ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ১০ লক্ষ টাকা দেওয়ার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়। উক্ত অফিস নোটে এমডি সাগীর হোসেন সহ মোট ১৪ জন কর্মকর্তা স্বাক্ষর করেন। 

মূলত এই চেক ইস্যু করা হয় আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ এর নামে। এ বিষয়ে জানতে- আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ এর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তার নামে চেক ইস্যু হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে পল্টন থানায় টাকা দেওয়ার বিষয় তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন আমার চাকরি কিছুদিন হল স্থায়ী হয়েছে আমি ছোট মানুষ এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। জনগণের টাকা এভাবে ঘুষ লেনদেনের কাজে ব্যবহারের সুযোগ আছে কিনা এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন এটা কিভাবে সম্ভব। এখানেই শেষ নয় এ ধরনের ঘুষ দেওয়ার একাধিক কর্মকাণ্ড করেন এমডি সাগীর হোসেন আরমিয়া ফকির ও তাদের অনুগত কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা বৃন্দ। আগস্ট ৩১ ২০২৫ তারিখে পিএলএফ/অফিস নোট/ অ্যাডভান্স/বিএম-৭৮/২০২৫ এর অফিস নোটে স্পেশাল তদবির উল্লেখ করে পল্টন থানা সহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ম্যানেজ করার কথা লিখে ৫ লক্ষ ২৫ হাজার টাকার একটি বিল অনুমোদন করেন এমডি সাগীর হুসেন ও তার অনুগত কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা। বেপরোয়া সাগীর হোসেন ২০/৮/২০২৫ তারিখে চেক নম্বও সিডি-বিও ৩৭৯৯৭৬ এর মাধ্যমে ড্রাইভার বেলালকে ৫ লক্ষ টাকা প্রদান করেন। 

বিশেষ সূত্রে জানা যায় প্রতিষ্ঠানটির আইন বিভাগের সাবেক একজন কর্মকর্তা বদিউল আলম সংক্রান্ত মামলায় ঘুষ প্রদানের জন্য ড্রাইভার বেলালকে এই টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।এ বিষয়ে জানতে ড্রাইভার বেলালের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে বেলাল টাকা রিসিভ করার বিষয়টি স্বীকার করেন। একজন ড্রাইভার হিসেবে আপনি এত টাকা কেন নিলেন এ প্রশ্নের উত্তরে ড্রাইভার বেলাল বলেন এটা অফিশিয়াল কাজে এমডি স্যার ও আরমিয়া ফকির স্যার নিতে বলেছিলেন। রমনা থানায় এই টাকা আপনি দিয়েছিলেন কিনা এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন সেটা বলা যাবে না।যে কথোপকথনের রেকর্ড সংরক্ষিত আছে। এ বিষয়ে জানতে সাবেক কর্মকর্তা বদীউল আলম এর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন আমি প্রতিহিংসার শিকার।১৬/৯/২০২৫ তারিখে পিপলস লিজিং এর আরেক কর্মকর্তা আশিকুর রহমানের নামে পাঁচ লক্ষ টাকার আরেকটি চেক ইস্যু করা হয়, চেকটি এমডি সাগীর হোসেন এর জন্য আশিক রিসিভ করেন বলে নোট করে রাখা হয়। 

উল্লেখ্য সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৫ তারিখের পিএলএফ/অফিস নোট/ কনসালটেশন/এজি/২০২৫ অফিস নোটে তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল বর্তমানে মাননীয় আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামানকে পাঁচ লক্ষ টাকা দেওয়ার জন্য বিল পাস করানো হয়। এ বিষয়ে জানতে আশিকের সাথে মুঠো ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান এটর্নি জেনারেল স্যারকে কোম্পানির একটি মামলায় পাঁচ লক্ষ টাকা কনসালটেন্সি ফি বাবদ দেওয়া হয়। জনগণের আমানতের টাকা এভাবে দিতে পারেন কিনা এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। এ বিষয়ে সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল বর্তমানে মাননীয় আইনমন্ত্রী মহোদয়ের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। এছাড়া এসকে রেজওয়ান উদ্দিন এর নামে ১/৭/২০২৫ তারিখে ঈউ-ই০৩৮২১৯৯ নম্বর চেকের মাধ্যমে এক লক্ষ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। ১৮/০৫/২০২৫ তারিখে সিডি-বিও ৩৮২৩২০ চেকের মাধ্যমে আরমিয়া ফকিরকে এক লক্ষ টাকা প্রদান করা হয় যেখানে আরমিয়া  নিজেই চেক রিসিভ করেন।

 পল্টন থানায় দায়েরকৃত জুলাই হত্যা মামলার অন্যতম আসামী রিগ্যাল কান্তি দাস কে ১৯-৫-২০২৫ তারিখে সিডি-বিও৩৮২৩৩৪ নম্বর চেকের মাধ্যমে এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা প্রদান করা হয়, এছাড়া ৮/৫/২৫ তারিখে ফখরুলকে এক লক্ষ টাকা, ২৩/৪/২০০২৫ তারিখে আরমিয়াকে এক লক্ষ টাকা প্রদান করা হয়। ২৫/৯/২০২৫ পর্যন্ত কোম্পানির এক হিসেবে দেখা যায় আরমিয়া ফকিরকে ৬,০২০,০০০ টাকা, শেখ রেজওয়ান উদ্দিনকে ২ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা, মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন কে ৫ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা, সাইফুল ইসলামকে ৬ লক্ষ টাকা, মোঃ ফখরুল ইসলামকে ৪ লক্ষ ৩৯ হাজার টাকা, মোঃ মোক্তাফ হোসেনকে ২ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা,আব্দুল্লাহ আল মাফুজকে ১২ লক্ষ ৫৪ হাজার টাকা,মোঃ আশিকুর রহমানকে ১০ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা, রিগ্যান কান্তি কে ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা, মোঃ ইমরান হোসেনকে ৫ লক্ষ ৬৩ হাজার ৫৭০ টাকা প্রদান করা হয় অগ্রিম বাবদ

এছাড়াও আরো বেশ কিছু টাকা অগ্রিম বাবদ প্রদান করা হয় যে হিসাব প্রায় কোটি টাকার কাছে।এ বিষয়ে এমডি সাগীর হোসেন, কোম্পানি সচিব আরমিয়া ফকির এবং চেয়ারম্যানের মতামত জানতে প্রতিষ্ঠানটির হেড অফিসে গেলে এমডি সাগীর হোসাইন এবং কোম্পানি সচিব আরমিয়া ফকির প্রতিবেদকের সামনে কোন রকম মতামত না দিয়েই তাড়াহুড়ো করে লিফটে নিচে নেমে যান এবং এমডি সাগীর হোসেন বলেন কোম্পানি সচিব আরমিয়া ফকিরের সাথে কথা বলতে। পরবর্তী দিন তাদের মতামতের জন্য আবারও হেড অফিসে গেলে তারা কেউই প্রতিবেদকের সাথে দেখা করেননি এবং কোন রকম মতামত দেননি।জনগণের আমানতের টাকা এভাবে ব্যক্তি স্বার্থে খরচ করার সুযোগ নেই বলে মত আইন বিশেষজ্ঞদের।
৭০০০ আমানত কারীর পক্ষে রাজিউল হাসান নামে একজন অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ২৩ শে নভেম্বর ২০২৪ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবর এমডি সাগীর হোসেন এর দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরে তার অপসারণের জন্য আবেদন করেন। অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগের অনুমোদন লেটারে রিকভারি করার আদেশ থাকলেও রিকভারি করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন না করে আমানতকারীদের অর্থের একটি অংশ ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংসের হীন চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছেন এমডি সাগির হোসেন ও তার অনুগত কতিপায় অসাধু কর্মকর্তা বৃন্দ।

 বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায় এমডি সাগীর হোসেন তার কার্যকালের মেয়াদ বাড়াতে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করেছেন।জনগণের আমানতের টাকার সঠিক সুরক্ষা ও যথাযথভাবে তা জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিতে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সাগীর হোসেন এর মত দুর্নীতিবাজদের অপসারণ সহ তাদের সঠিক বিচারের মুখোমুখি করার দাবি ভুক্তভোগীদের। এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট সকল মহলের যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সহ সংশ্লিষ্ট সকলে।

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!