ডেইলি খবর ডেস্ক: শহরের অলি-গলির বাসা-বাড়িসহ নানারকমে নির্মিত বহুতল ভবনের মাঝখানে সরু ফাঁকা জায়গা। দিনের আলো ঠিকমতো ঢোকে না সেখানে। বৃষ্টির পানি জমে থাকে, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকে ভাঙা পাত্র, প্লাস্টিকের কৌটা কিংবা নির্মাণসামগ্রীর অংশ। বাইর থেকে জায়গাটি সহজে চোখেও পড়ে না। অথচ এমন অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে জায়গাই হয়ে উঠছে এডিস মশার বিপজ্জনক প্রজননস্থল।
রাজধানীর লালমাটিয়ার নিউ কলোনিতে সম্প্রতি এমন একটি জায়গায় জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা পেয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মশকনিধন কর্মীরা। ভবনের পাশে ছোট একটি ঘর ও তার আশপাশে জমে থাকা পানিতেও লার্ভা পাওয়া গেছে। বিশেষ করে দুই ভবনের মাঝখানের ফাঁকা অংশ এবং ভবনের নিরাপত্তাকর্মী বা তত্ত্বাবধায়কদের ঝুপড়ি ঘরের আশপাশে সবচেয়ে বেশি লার্ভা শনাক্ত হচ্ছে বলে জানান তারা।
নগরীর দুই ভবনের মধ্যবর্তী স্যাঁতসেঁতে স্থান থেকে শুরু করে ঘরের বারান্দায় রাখা ফুলের টব ও পাত্রে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবৃদ্ধি করছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের জরিপ অনুযায়ী, বহুতল ভবনে সবচেয়ে বেশি ৩৫.২৩ শতাংশ লার্ভা পাওয়া গেছে। এছাড়া জমে থাকা মেঝের পানি, বালতি ও প্লাস্টিকের ড্রামকে এডিসের অন্যতম প্রধান আঁতুড়ঘর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে, শুধু দুই বাড়ির মাঝের ফাঁকা জায়গা নয়, ডেঙ্গুর ঝুঁকি এখন লুকিয়ে আছে নগরবাসীর ঘরের ভেতরেও। বারান্দার ফুলের টব, টবের নিচের ট্রে, ফুলদানি, বালতি, ড্রাম, এসির ট্রে, ছাদের কোণ কিংবা অব্যবহৃত পানির পাত্র— সামান্য পানি জমলেই সেখানে এডিস বংশবৃদ্ধি করছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাম্প্রতিক এক জরিপে বহুতল ভবনকে এডিসের অন্যতম প্রধান প্রজননস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, বহুতল ভবনেই সবচেয়ে বেশি— ৩৫ দশমিক ২৩ শতাংশ লার্ভা পাওয়া গেছে। এরপরই রয়েছে একক বাড়ি ও নির্মাণাধীন ভবন। প্রজননস্থলের ধরন হিসাবে মেঝের পানিতে ১২ দশমিক ২৬ শতাংশ, বালতিতে ১০ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং প্লাস্টিকের ড্রামে ৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ লার্ভা পাওয়া গেছে।
মহানগরে ডেঙ্গু এখন আর কেবল মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি কাঠামোগত নগর স্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রজনন উৎস নিয়মিত নজরদারির মাধ্যমে ধ্বংস করতে পারলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
এছাড়া ফুলের টব, অব্যবহৃত পানির ট্যাংক, এসির ট্রে ও নির্মাণাধীন ভবনের বেজমেন্টকেও মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ এডিসের বংশবিস্তারের জন্য বড় কোনো জলাশয়ের প্রয়োজন নেই; বাড়ির বারান্দায় শখ করে রাখা পাত্রের অল্প পানিই যথেষ্ট। আর পানি ফেলে দেওয়ার পরও পাত্রটি ঘষে পরিষ্কার না করায় ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পানি ফেলে দিলেও পাত্রের গায়ে এডিসের ডিম লেগে থাকতে পারে। ফলে শুধু পানি ফেলে দিলে ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না, পাত্রটি ভালো করে ঘষে পরিষ্কার করা জরুরি।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর চিত্র-চলতি বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ আবারও দ্রুত বাড়ছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৭ হাজার ৩৬৭ জন এবং মারা গেছেন ২০১ জন। ইতোমধ্যেই মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২০২২ সালের পুরো বছরের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। তবে, মৃত্যুর সংখ্যা বিগত বছরের তুলনামূলক কিছুটা কম।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের পুরো বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ৪১৩ জনের। অর্থাৎ চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাস শেষ হওয়ার আগেই গত বছরের মোট আক্রান্তের প্রায় ৬৫ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং মোট মৃত্যুর ৪৮ দশমিক ৭০ শতাংশ পার হয়ে গেছে।
ডেঙ্গু বিশ্লেষকরা বলছেন, বছরের শেষ প্রান্তিকে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। কারণ, বিগত বছরগুলোতেও সেপ্টেম্বরের পর অক্টোবর ও নভেম্বরে আক্রান্তের বড় উল্লম্ফন দেখা গিয়েছিল। ২০২৫ সালের কেবল নভেম্বর মাসেই সর্বোচ্চ ২৪ হাজার ৫৩৫ জন এবং অক্টোবরে ২২ হাজার ৫২০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।
বিগত বছরগুলোর চিত্র দেখলে পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক তা স্পষ্ট হয়। ২০২৪ সালে ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন আক্রান্ত ও ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে রেকর্ড ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন আক্রান্ত এবং ১ হাজার ৭০৫ জন মারা যান। অন্যদিকে ২০২২ সালে মোট আক্রান্ত ছিলেন ৬২ হাজার ৩৮২ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ২৮১ জনের। অর্থাৎ চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়েই আক্রান্তের সংখ্যা ২০২২ সালের পূর্ণ বছরের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ বেশি হয়ে গেছে।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়েই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ২০২২ সালের পুরো বছরের রেকর্ডকে ছাপিয়ে গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ইতিমধ্যে ৬৭ হাজার ছাড়িয়েছে এবং প্রাণহানি ঘটেছে দুইশতেরও বেশি মানুষের। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বছরের শেষ প্রান্তিক অর্থাৎ অক্টোবর ও নভেম্বরে সংক্রমণ ও রোগী ভর্তির হার আরও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে পারে। প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের প্রধান কাজ হচ্ছে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা ও নিয়মিত নজরদারি চালানো। শুধু রোগী শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার প্রস্তুতি নিয়ে সংক্রমণের মূল উৎস বন্ধ করা সম্ভব নয়।
তার মতে, মহানগরে ডেঙ্গু এখন আর কেবল মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি কাঠামোগত নগর স্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রজনন উৎস নিয়মিত নজরদারির মাধ্যমে ধ্বংস করতে পারলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই কেবল হাসপাতালে নয়, শুরু হতে হবে মানুষের বাড়ি, বিদ্যালয়, কর্মস্থল এবং স্থানীয় জনসমাজ থেকে। বৃষ্টিকে যদি আমরা ডেঙ্গুর জন্য শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখি, তাহলে সংকট আরও গভীর হবে। কিন্তু বৃষ্টির পর যদি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা যায়, তাহলে ডেঙ্গুর এই বার্ষিক দুর্ভোগ থেকে দেশকে ধীরে ধীরে মুক্ত করা সম্ভব।
শুধু ফগিং ও লার্ভিসাইডিং সমাধান নয়-গত ১১ বছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মশক নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৮২৫ কোটি টাকা ব্যয় করলেও ডেঙ্গুর পুনরাবৃত্তি ঠেকানো যায়নি। প্রতি বছরই ধোঁয়া ছিটানো (ফগিং), লার্ভিসাইডিং ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে, বড় অঙ্কের এই ব্যয় এডিস মশার প্রজননস্থল স্থায়ীভাবে ধ্বংস করতে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখছে কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই কেবল হাসপাতালে নয়, শুরু হতে হবে মানুষের বাড়ি, বিদ্যালয়, কর্মস্থল এবং স্থানীয় জনসমাজ থেকে। বৃষ্টিকে যদি আমরা ডেঙ্গুর জন্য শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখি, তাহলে সংকট আরও গভীর হবে। কিন্তু বৃষ্টির পর যদি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা যায়, তাহলে ডেঙ্গুর এই বার্ষিক দুর্ভোগ থেকে দেশকে ধীরে ধীরে মুক্ত করা সম্ভব।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন-বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্বল নজরদারি, প্রয়োজনীয় কীটতত্ত্ববিদদের অভাব এবং প্রজননস্থল চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়ায় মশানিধন কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না।
অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, সিটি করপোরেশনের বিভাজন কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল হলেও মশা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত সেই চক্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। তার মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মৌসুমি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। একটানা অন্তত পাঁচ বছর কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটিভিত্তিক উদ্যোগ জোরদার এবং প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদের কাজে যুক্ত করতে হবে।
দায়িত্ব নিতে হবে নগরবাসীকেও-ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু সিটি করপোরেশনের ওপর ভরসা রাখা যেমন ভুল, তেমনি সব দায় সাধারণ নাগরিকদের ওপর চাপানোও ঠিক নয়। দুই পক্ষের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা দরকার।
ঘরের ভেতরে বা আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া বাড়িওয়ালা ও বাসিন্দাদের দায়িত্ব। ফুলের টবের ট্রে, এসির ড্রেন, বালতি, ড্রাম ও অব্যবহৃত পাত্র সপ্তাহে অন্তত এক দিন পরিষ্কার করতে হবে। অন্যদিকে রাস্তাঘাট, ড্রেন, সরকারি-বেসরকারি উন্মুক্ত জায়গা ও বড় বর্জ্য ফেলার স্থানগুলো নিয়মিত পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের।
ইতোমধ্যে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান নগরবাসীর সহযোগিতা চেয়ে একটি বিশেষ খোলা চিঠি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। চিঠিতে তিনি সপ্তাহে অন্তত এক দিন নিজ নিজ বাসা, ছাদ, বারান্দা ও আঙিনা পরীক্ষা ও পরিষ্কার করার অনুরোধ জানিয়ে লিখেছেন, ‘নিজের বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব। এই অভ্যাসের মাধ্যমেই আপনারা ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।’
মূলত বড় কোনো অভিযানের চেয়ে নাগরিক জীবনের ছোট ছোট সচেতন অভ্যাসই ডেঙ্গু প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি। প্রতি ঘরে সচেতনতা তৈরি হলে এডিসের প্রজনন কারখানাগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করা সম্ভব।সংগৃহীত ছবি, সুত্র-ঢাকাপোষ্ট

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :