শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ৬ ভাদ্র ১৪৩৩

রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে উগ্রবাদের পুনরুত্থান ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ২১, ২০২৬, ০১:১৩ পিএম

রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে উগ্রবাদের পুনরুত্থান ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ

বিশেষ প্রতিনিধি: ​শস্য শ্যমলা সুজলা সুফলা বাংলাদেশ। এই দেশে রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রাম কম হয়নি। তারপরও বিশ্বের বুকে বারবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে আমাদেরই এই দেশ।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কাঠামোর সমন্বয়হীনতার সুযোগে উগ্রপন্থী সংগঠনগুলোর পুনরাগমনের আলামত দেখা যাচ্ছে। 
উগ্রবাদ ও ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শকে একই পাল্লায় মাপা বা রাজনৈতিক স্বার্থে উগ্রপন্থাকে প্রশ্রয় দেওয়া যে কোনো রাষ্ট্রের জন্য চরম আত্মঘাতী পদক্ষেপ। 
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের এই সংকটময় চিত্র ও এর রাজনৈতিক-সামাজিক সমীকরণ নিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই প্রতিবেদন।

ক্ষমতার শূন্যতা ও নজরদারির ঘাটতি
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে যে প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয়। তার সুযোগে উগ্রবাদের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া অনেকেই ধারাবাহিকভাবে জামিনে মুক্তি পান। আসামির জামিন পাওয়ার আইনি অধিকার থাকলেও জামিন-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের যে নিবিড় তদারকি, নিয়মিত হাজিরা এবং গোয়েন্দা নজরদারি নিশ্চিত করার কথা ছিল, সেখানে চরম প্রশাসনিক শিথিলতা দেখা গেছে। ​এইসব কারণে পুরনো নেটওয়ার্কের পুনর্জাগরণ ঘটেছে।

উগ্রবাদ কখনো হঠাৎ করে শূন্য থেকে তৈরি হয় না, বরং সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। এর প্রত্যক্ষ উদাহরণ নব্য জেএমবির সমন্বয়ক নাজমুল হাসান মামুন (বোমারু মামুন)। ২০১৭ সাল থেকে কারাবন্দি থাকা এই ব্যক্তি ২০২৪ সালের পর মুক্তি পেয়েই কেরানীগঞ্জ ও সাভার এলাকায় নতুন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের তদন্ত অনুযায়ী, ১৫ জনের একটি দল গঠন করে কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, কুমিল্লা, ডেমরা ও সাভারে বিস্ফোরক ও আইইডি হামলার পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন তিনি।
জামিনে মুক্তির পর উগ্রপন্থী নেতাদের জনসমক্ষে উপস্থিতি মতাদর্শিক স্বাভাবিকীকরণের পথ তৈরি করছে। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসীম উদ্দিন রাহমানী দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকার পর জামিনে বের হয়ে শাহবাগের মতো প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। একইভাবে ২০২১ সালের সংহিসতার একাধিক মামলার আসামি হেফাজত নেতা হারুন ইজহারও অন্তর্র্বতী সরকারের আমলে ধারাবাহিকভাবে জামিন পান।

অনলাইন উগ্র প্রচারণা এবং ব্লাসফেমির অভিযোগে সহিংসতা উসকে দেওয়ার অভিযোগে যুক্ত আতাউর রহমান বিক্রমপুরীর ভূমিকা আরও উদ্বেগজনক। আগস্টের পর কাশিমপুর কারাগারের সামনে ‍‍`বৈষম্যবিরোধী কারামুক্তি আন্দোলন‍‍`-এর সমন্বয়ক পরিচয়ে বন্দি জঙ্গিদের মুক্তির দাবিতে তাকে প্রকাশ্যে সক্রিয় হতে দেখা যায়। পরবর্তীতে তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দীর্ঘ সময় লেগেছে, যা তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতাকে নির্দেশ করে।
​পরিসংখ্যানের ভয়াবহ বার্তা ও তদারকির ধস নেমেছে। অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নিষিদ্ধ সংগঠনের ১,৬১১ জন জঙ্গি জামিনে মুক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৫ আগস্টের পর মুক্তি পাওয়া প্রায় ৩৮০ জন আসামি আদালতে নিয়মিত হাজিরাই দিচ্ছেন না। জেএমবি, আনসার আল ইসলাম, হিযবুত তাহরীর ও হুজির মতো সংগঠনের বহু সদস্যের এভাবে আত্মগোপনে যাওয়া প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রের প্রবেশন ও নিরাপত্তা কাঠামো কতটা ভঙ্গুর।

মিডিয়ার ভূমিকা ও বয়ান তৈরির ঝুঁকি
রাজনীতি ও বিচার ব্যবস্থার পাশাপাশি গণমাধ্যমের শব্দচয়নও জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ায়। রাজনৈতিক হয়রানির মামলার সমালোচনা করা যৌক্তিক, কিন্তু সন্ত্রাসবাদে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সংবাদমাধ্যমে ‍‍`মজলুম‍‍` হিসেবে উপস্থাপন করলে অনুসারীদের কাছে তার অপরাধ আড়াল হয়ে যায়। উগ্রপন্থীদের প্রধান হাতিয়ার কেবল বিস্ফোরক নয়, বরং গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে তৈরি করা এই সহানুভূতিশীল ‍‍`বয়ান‍‍`।

অন্তর্র্বতী সরকারের সমর্থকদের মতে, আদালত স্বাধীন হওয়ায় সরকার জামিনে হস্তক্ষেপ করেনি। আইনি প্রক্রিয়ার বিচারে এটি সঠিক হলেও রাজনৈতিক ও নিরাপত্তার দিক থেকে এটি অসম্পূর্ণ। আদালত জামিন দিলেও মুক্তিপ্রাপ্ত উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের গতিবিধি তদারকি করা এবং অনলাইন বা অফলাইন উগ্র প্রচারণা ঠেকানো সম্পূর্ণ নির্বাহী রাষ্ট্রের দায়িত্ব, যেখানে চরম ব্যর্থতা ফুটে উঠেছে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে অবশ্যই ভিন্নমতের রাজনৈতিক বন্দি এবং রাষ্ট্রের অস্তিত্বের হুমকি তৈরি করা উগ্রবাদীদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখতে হবে। সরকারের পরিবর্তনের পর পুরনো মামলা প্রত্যাহারের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু রয়েছে, সেখানে বিএনপির জন্য একটি বড় শিক্ষা রয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলার সঙ্গে প্রকৃত উগ্রবাদের মামলাকে এক করে ফেলার প্রলোভন এড়াতে হবে; অন্যথায় এটি নিজেদের জন্যই কাল হয়ে দাঁড়াবে।
​সাময়িক জোটের আত্মঘাতী ফলাফলও ঘটে থাকে। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, উগ্রপন্থী ও উগ্র আদর্শভিত্তিক দলগুলো কখনো কোনো মূলধারার রাজনৈতিক দলের স্থায়ী মিত্র হয়নি। সাময়িক ক্ষমতার সমীকরণে তারা রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করে কেবল নিজেদের ভিত্তি শক্ত করে। ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং পুরো রাষ্ট্রের মূল চরিত্র পরিবর্তনই থাকে তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।
​উগ্রবাদ দমন ভবিষ্যতের নৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে। একটি সভ্য ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের পরিচিতি শুধু সে কতজনকে বন্দি রাখল তা দিয়ে হয় না, বরং সে কাকে মুক্তি দিচ্ছে এবং মুক্তির পর আইনের শাসন কতটা কঠোরভাবে বজায় রাখছে তা দিয়ে নির্ধারিত হয়। উগ্রবাদ দমনের নামে যেমন বিরোধী মতামত দমন করা যাবে না, তেমনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে সহিংস উগ্রবাদকে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না—এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
এই প্রতিবেদনের সবই যে কথার কথা তা নয়। এর রেফারেন্স গুলোও প্রামাণ্য। 
 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!