বিপ্লব দাশ,বান্দরবান প্রতিনিধিঃ বান্দরবানের লামা বনবিভাগে বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে উঠেছে ভয়াবহ দুর্নীতি, ঘুষ, মাসোহারা, বদলি বাণিজ্য, সংরক্ষিত বন ধ্বংস, টাকার বিনিময়ে মামলা গায়েবসহ নানা অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ।যেখানে বন রক্ষা করার কথা, সেখানে অভিযোগ উঠেছে ডিএফও নিজেই ঘুষের বিনিময়ে বন ধ্বংসের মহাযজ্ঞে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করছেন অসাধু ব্যবসায়ীদের। যোগদানের পর থেকেই তিনি লামা বনবিভাগকে অবৈধ আয়ের তীর্থস্থান হিসেবে তৈরি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী, কাঠ ও বাঁশ ব্যবসায়ী, করাতকল মালিক, ইটভাটা ব্যবসায়ী সবার কাছ থেকেই মিলেছে একই ধরনের অভিযোগ। তবে চট্টগ্রাম বনবিভাগের আঞ্চলিক কর্মকর্তা (সিএফ) মোল্লা রেজাউল করিমের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় দিন দিন অনিয়মের পরিধি বাড়িয়েই চলেছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
জানা গেছে, মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ নতুন নয়। এর আগে রাঙামাটিতে দায়িত্ব পালনকালে সংরক্ষিত বন ধ্বংসের ঘটনায় তাকে ওএসডি করা হয়েছিল। পরে সিএফ মোল্লা রেজাউল করিমের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে ডিএফও হয়ে লামায় যোগ দেন। এরপর থেকেই আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি।
বাঁশ মহাল বন্ধ, রাতের আঁধারে পাচার
লামা বনবিভাগে চারটি সংরক্ষিত বন রয়েছে। এর মধ্যে মাতামুহুরি সংরক্ষিত বন থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪৫ লাখ টাকা এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৫ লাখ টাকার বাঁশ মহাল নিলাম দিয়েছিল বনবিভাগ। কিন্তু মোস্তাফিজুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বাঁশ মহালের নিলাম বন্ধ রাখা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নিলাম বন্ধ থাকলেও কমিশনের বিনিময়ে রাতের আঁধারে গাড়ি ও নদীপথে বাঁশ পাচারের সুযোগ করে দেওয়া হয়। ফলে সরকার রাজস্ব হারালেও ডিএফও ব্যক্তিগত লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।
বাঁশ ব্যবসায়ী আমির হোসেন বলেন,লামারমুখে টাকা দিয়ে বাঁশ পার করা যায়। টিপি ছাড়া বাঁশের জন্য ৫ টাকা করে দিতে হয় লামারমুখের দায়িত্বরত ব্যক্তিকে। প্রতিটি বাঁশ গুণে টাকা নেওয়া হয়। বাঁশ নিলামে না দেওয়ায় সরকার ও সাধারণ ব্যবসায়ীরাই সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সংরক্ষিত বন থেকে গাছ পাচার বেদখলের সহায়তা
স্থানীয় সংবাদকর্মী তানজিমুল হক মাহিম জানান, বমু বিলছড়ি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি গাছ কেটে পাচার হয়েছে মোস্তাফিজুর রহমানের আমলে।
তিনি বলেন,রাতের আঁধারে বমু রিজার্ভ থেকে গাছ কেটে ফাইতং সড়ক হয়ে বিভিন্ন এলাকায় নেওয়া হয়। প্রতি কাঠবোঝাই গাড়ি থেকে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা তাকে জানিয়েছেন। ফলে পথে কেউ গাড়ি আটকায় না।
সে অভিযোগ করে বলেন, পাচারের খবর ডিএফওকে জানালে উল্টো সেই তথ্য পাচারকারীদের কাছেই পৌঁছে যায় মুহূর্তেই। ফলে ব্যবসায়ীরা আক্রমণাত্মক আচরণ করে।
স্থানীয় বনবিভাগ সূত্রে জানা যায় সাঙ্গু সংরক্ষিত বন এখন বেদখলে। সংরক্ষিত বন উদ্ধার না করে দখলের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান।
টিপি ও জোত পারমিটে কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য
ঝাড়ুফুল ও ফার্নিচারবাহী গাড়ি থেকে পরিবহন অনুমোদন (টিপি) নামে ২ হাজার টাকা করে ঘুষ নেন,কাটা না দিলে টিপি না দিয়ে আজকে কালকে বলে হয়রানি করেন অভিযোগ করেন ব্যবসায়ীরা
। মাসে গড়ে ৩০-৪০টি ঝাড়ুফুল ও ফার্নিচারবাহী গাড়ি চলাচল করে। বর্তমানে রাতে ফার্নিচার,ছন,ঝাড়ুফুলের গাড়ী গেলেও কোন টিপি কাটা হচ্ছে না, সরকার টাকা না পেলেও ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান সিন্ডিকেটের সদস্য লতিফ, করিমের মাধ্যমে ৫ থেকে ৭ টাকা করে নিচ্ছে।
ব্যক্তি মালিকানাধীন গাছ বিক্রির জন্য ফ্রি জোত পারমিটও ডিএফওর সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস। অভিযোগ রয়েছে, খাড়া মার্কিং ও সাইজলিস্ট (টিপি) দেওয়ার নামে প্রতি ফুট কাঠে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা করে ঘুষ নেওয়া হয়। চলতি অর্থবছরে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার ফুট কাঠের জোত পারমিট দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ফুটে ৬০ টাকা ধরে মাত্র ছয় মাসেই প্রায় ১ কোটি টাকার ঘুষ আদায় করেন লামা বিভাগী বন কর্মকর্তা।
ঘুষ না দিলে ফাইল আটকে রাখা, তদন্তের নামে হয়রানি এবং কাঠের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। জোত মালিক সমিতির এক নেতা বলেন,ডিএফওর ঘুষ বাণিজ্যের কারণে এখন অনেক কাঠ ব্যবসায়ী নতুন জোত পারমিট নিতে আগ্রহ হারিয়েন তারা।
করাতকল ও ইটভাটায় মাসোহারা
একাধিক করাতকল মালিক জানিয়েছেন, প্রতি করাতকল থেকে মাসে ৫ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। লামায় থাকা ৩৫টি করাতকল থেকে মাসিক ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ঘুষ হিসেবে নেওয়া হয়।
অন্যদিকে ইটভাটাগুলোতে জ্বালানি কাঠ জব্দের ভয় দেখিয়ে প্রতি ইটভাটা থেকে ১০ হাজার টাকা করে মাসোহারা নেওয়া হয়। বনবিভাগের আওতাধীন ৪০টি ইটভাটা থেকে মাসোহারা হিসেবে প্রায় ৪ লাখ টাকা ঘুষ নেন।
এছাড়া প্রতি লাকড়ি ও কাঠবোঝাই গাড়ি থেকে ৩ হাজার টাকা এবং গাড়িভেদে ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ডিএফওর বিরুদ্ধে ।
লামারমুখ চেকস্টেশন: অবৈধ আয়ের বড় কেন্দ্র
ডিএফওর আয়ের অন্যতম বড় উৎস হিসেবে পরিচিত লামারমুখ চেকস্টেশন। অভিযোগ অনুযায়ী, এখান থেকে মাসে দেড় লাখ টাকা মাসোহারা নেওয়া হয়। এছাড়াও এক সাবেক রেঞ্জ কর্মকর্তা জানান, অবৈধ বাঁশ ও কাঠ পরিবহন থেকে আদায় করা অর্থ দিয়েই ডিএফওর বাসা ও অতিথি আপ্যায়নের ব্যয় নির্বাহ করা হয়।
বদলি বাণিজ্যে লাখ লাখ টাকা
ডিএফওর বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো বদলি বাণিজ্য।
অভিযোগ রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জে বদলির জন্য ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা, কম গুরুত্বপূর্ণ বিট ও রেঞ্জে প্রায় ৫ লাখ টাকা এবং ফরেস্ট গার্ড ও বাগান মালিদের বদলিতে ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেন ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান।
জানা গেছে,আলতাফ হোসেনকে ৮ লাখ টাকায় লামা সদর রেঞ্জ, পরে বমু বিট ও লামারমুখ চেক স্টেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়, আব্দুল মালেককে ৩ লাখ টাকায় মাতামুহুরি রেঞ্জ, পরে আরও ৬ লাখ টাকায় অতিরিক্ত লামা সদর রেঞ্জে,তানভির খলিল চৌধুরীকে নাইক্ষ্যংছড়ি রেঞ্জ ও পরে সাঙ্গু রেঞ্জের অতিরিক্ত দায়িত্বে ৪ লাখ টাকা,মোস্তাফিজকে ৫ লাখ টাকায় ইয়াংছা বিট কর্মকর্তা করা হয়।
ক্যাশিয়ার সিন্ডিকেট
ফরেস্ট গার্ড লতিফ ও বাগান মালি করিমকে ডিএফওর ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে। অভিযোগ রয়েছে,ব্যবসায়ীদের আগে থেকেই লাকড়ি বা কাঠবোঝাই গাড়ী নিতে তাদের মাধ্যমে লাইন নিতে হয়। অনুমতি ছাড়া কাঠ বা লাকড়ির গাড়ি চললে গাড়ি আটক করে মোটা অঙ্কের ঘুষ আদায় করে বড় অংশ নিজে রেখে বাকী অংশ ভাগবাটোয়ারা করে দপন ডিএফও নিজে । গাড়ী জব্দ করা হলেও গাড়ী জন্য ৫০ হাজার টাকার নেওয়া হলেও উল্লেখ করা হয় ৩০ হাজার টাকা।
বাগান মালি করিম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি ছোট পোস্টে চাকরি করি। আমার কাজ রেস্টহাউজ দেখাশোনা করা। ডিএফওর ক্যাশিয়ার-এটা সঠিক নয়। বড় স্যাররা যা দায়িত্ব দেন, তা পালন করি।
টাকার বিনিময়ে মামলা গায়েব
অনুসন্ধানে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে টাকার বিনিময়ে মামলার নথি গায়েবের অভিযোগ।
২০২৫ সালের জুনে সেনাবাহিনী ও বনবিভাগের যৌথ অভিযানে এক কাঠ ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে সেগুন কাঠ জব্দ করা হয়। ওই ঘটনায় তিনজনকে আসামি করে মামলা হয়। কিন্তু অভিযোগ, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সেলিম নামের এক ব্যবসায়ীকে বাঁচাতে মামলার নথি রেজিস্টার ও মাসিক প্রতিবেদনে থাকলেও আদালতে জমা দিতে দেন ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান।বিষয়টি জানাজানি হলে প্রায় ছয় মাস পর কারসাজির মাধ্যমে আদালতে মামলার কাগজ পত্র জমা দেওয়া হয়। সেই মামলার এক আসামি মো.মাহাবুব বলেন,আমার কাঠ জব্দ করে মামলা করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন আদালতে ঘুরেও মামলার হদিস পাইনি। প্রায় ছয় মাস পর মামলাটি আদালতে পাওয়া যায়।
তবে বনবিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানের নির্দেশে তার অধীনস্থ তৎকালীন রেঞ্জ কর্মকর্তা আলফাত হোসেন নথি গায়েব করেন।
মাতামুহুরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের রেঞ্জ কর্মকর্তা বলেন,বাঁশ মহাল বন্ধ থাকায় সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে-এটা সত্য। তবে আমরা সীমিত জনবল নিয়েও বাঁশ পাচার বন্ধে টহল জোরদার করেছি এবং বাঁশ মহাল নিলামের জন্য কাজ করছি।
এ বিষয়ে লামা বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোস্তাফিজুর রহমানের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে নেটওয়ার্ক সমস্যার কথা বলে পরে কথা বলবেন জানান। পরবর্তীতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত বক্তব্য চেয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
এদিকে লামা বনবিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানা চট্টগ্রাম বনবিভাগ আঞ্চলিক কর্মকর্তা (সিএফ) মিহির কুমার দো।

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :