বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

বেনজীর ও স্বাস্থ্যের মিঠুর ১৮০ বিঘা জমিতে দুই খামার

আইন-অপরাধ ডেস্ক

প্রকাশিত: জুন ৮, ২০২৪, ১০:০৫ এএম

বেনজীর ও স্বাস্থ্যের মিঠুর ১৮০ বিঘা জমিতে দুই খামার


দেশের স্বাস্থ্যখাতের মাফিয়া ঠিকাদার মিঠুর সাথেও যৌথ ব্যবসা পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীরের। শুধু কি তাই, ব্যাংক, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগসহ ঢাকায় বিপুল সম্পদ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলায় শত শত বিঘা জমির মালিক পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) বেনজীর আহমেদ। গরীব কৃষকের জমি দখলকরা, জোর করে কম দামে  কেনার পাশাপাশি ক্ষমতার দাপটে সাধারণ মানুষের জমি দখল করে গড়ে তুলেছেন দেশের বিভিন্নস্থানে রিসোর্ট ও খামার। বিদেশেও কিনেছেন বাড়ি-গাড়ি, জমিয়েছেন টাকা। প্রতিদিনই নতুন নতুন সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসছে সাবেক এই পুলিশপ্রধানের।
নানারকম দুগন্ধের মধ্যে এবার জানা গেছে, স্বাস্থ্য খাতের বিতর্কিত ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম ওরফে মিঠুকে সঙ্গে নিয়ে দুটি মুরগির খামার গড়ে তুলেছেন বেনজীর আহমেদ। এসব খামারের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি দখল করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নামমাত্র মূল্যে কৃষকের কাছ থেকে জোর করে জমি কেনা হয়। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের দৌলতপুর উপজেলায় প্রায় ৯০ বিঘা জমির ওপর ‘নর্থস এগ লিমিটেড’ এবং নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ৯০ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে ‘নর্থস চিকস লিমিটেড’। স্থানীয় এলাকাবাসীর তথ্য এবং কোম্পানির নথি ঘেঁটে দেখা যায়, ২০০৯ সালে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘নর্থস এগ লিমিটেড’। প্রায় ৯০ বিঘার জমির ওপর স্থাপিত পোলট্রি খামারটির বেশিরভাগ জায়গাই কৃষকদের নামমাত্র মূল্য দিয়ে দখল করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) বেনজীর আহমেদ ও স্বাস্থ্য খাতের বিতর্কিত ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম ওরফে মিঠু। পোলট্রি খামারটি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার দৌলতপুর ও গৌরিপুর মৌজার কয়েক গ্রামের মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকির
কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খামারের বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। তীব্র দুর্গন্ধে ওই দুই মৌজার পাঁচ-সাত গ্রামের বাসিন্দাসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
জানা গেছে, স্বাস্থ্য খাতের বহুল বিতর্কিত ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুর গ্রামের কছিরউদ্দীনের ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল মিঠুর হাতে। নামে-বেনামে তিনি গড়ে তুলেছেন অঢেল সম্পদ।
সূত্র বলছে, পোলট্রি ব্যবসায় নামতে বেনজীরকে প্রভাবিত করেন মিঠু। আর এ ক্ষেত্রে বেছে নেওয়া হয় মিঠুর নিজের এলাকা রংপুরের বিভিন্ন অঞ্চল। সে অনুযায়ী নীলফামারী ও ঠাকুরগাঁওয়ে গড়ে তোলা হয়েছে পোলট্রি ফার্ম।
জানা গেছে, নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার উত্তর চাঁদখানা এলাকায় কৃষকদের প্রায় ৩০ একর জমি দখলে নিয়ে তৈরি করা হয়েছে ‘নর্থস চিকস রংপুর লিমিটেড’ নামে পোলট্রি ফার্ম। ২০১৩ সালে কোম্পানির প্রতিষ্ঠাকালে এর নাম ছিল নর্থস পোলট্রি লিমিটেড। এ কোম্পানি গড়ে প্রতিষ্ঠার জন্যও চতুরতার আশ্রয় নিয়েছেন বেনজীর। কোম্পানির নথিপত্রে কোথাও নিজের নাম ব্যবহার করেননি তিনি। কোম্পানিতে সাতজন অংশীদার রয়েছেন। তবে অবাক করা তথ্য হচ্ছে, এসব অশীদারের প্রত্যেকের একই মোবাইল নম্বর এবং ইমেইল ব্যবহার করা হয়েছে। নথিতে বেনজীর আহমেদের দুই মেয়ে ফারহিন রিসতা বিনতে বেনজীর ও তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের প্রত্যেকের ৫০ হাজার করে শেয়ারের তথ্য রয়েছে। এসব বিষয়ে জানতে প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার (অ্যাডমিন ও এইচআর) মো. সিরাজুল হকের সঙ্গে অনেক চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। নীলফামারীর পাশাপাশি ঠাকুরগাঁওয়ে পোলট্রি ফার্ম স্থাপনেও নানা ধরনের অনিয়মের আশ্রয় নেন বেনজীর। এ ক্ষেত্রে কৃষকদের জমি জোর করে দখল করা হয়।
স্থানীয়রা বলছেন, বড় খামারের মুরগির বিষ্ঠা মাছের খাবার ও কৃষিজমির সার হিসেবে বিক্রি হয়। আবার অনেক সময় কারখানার ভেতরেই রয়ে যায় এসব বিষ্ঠা। দুর্গন্ধে আশপাশের মানুষের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। খামারের আশপাশের রাস্তায় চলতে হয় দুর্গন্ধের মধ্য দিয়ে। মুরগির বিষ্ঠা ট্রাকে করে নেওয়ার সময় গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে। রাস্তা খারাপ হওয়ায় ঝাঁকুনিতে ট্রাক থেকে বিষ্ঠা পড়ে যায়। ফলে ওসব সড়কেও দুর্গন্ধের মধ্য দিয়ে চলতে হয় সাধারণ মানুষকে। সরেজমিন দৌলতপুর এলাকায় ঘুরেও দেখা যায় একই চিত্র। খামারটির ব্যবস্থাপক ডা. ফেরদৌস আলম জানান, এখানে খামারে ৩ লাখের বেশি মুরগি আছে। এসব মুরগির বিষ্ঠা বিক্রি করা হয় ব্যবসায়ী ও মৎস্য খামারিদের কাছে।
খামারটির ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, পেছনে বিষ্ঠা ফেলার একটি ভাগাড়। এর দেয়াল ঘেঁষেই জনবসতি। গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, বিষ্ঠার দুর্গন্ধে থাকা যায় না। রোদ উঠলে বাতাসে গন্ধ আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ে। একই গ্রামের খাদেজা বেগমসহ কয়েকজন নারী অভিযোগ করে বলেন, গন্ধে বমি আসে। তৃপ্তি নিয়ে খাওয়াদাওয়া করা যায় না। মশামাছির উপদ্রবের কারণে রাতদিন মশারি টানিয়ে খেতে হয়। শিউলি আক্তার বলেন, গন্ধে ঘুমাতেও কষ্ট হয়। উপজেলা পরিষদের বলাকা উদ্যান নামে একটি বিনোদন পার্কের ব্যবস্থাপক হাসান আলী বলেন, মুরগির বিষ্ঠার গন্ধ ও মশামাছি-পোকার উপদ্রবে পার্কটিতে কেউ আসেন না।
ঠাকুরগাঁও আড়াইশ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. তোজাম্মেল হক বলেন, খামার এলাকার অনেক মানুষ তার কাছে চিকিৎসা নিচ্ছেন। পোলট্রি বর্জ্যের কণা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ঢুকে ফুসফুসের রোগের কারণ হতে পারে। এর থেকে শ্বাসকষ্ট এবং হার্টের ক্ষতি হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। এসব খামার সংলগ্ন এলাকার মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে থাকে।একই চিত্র দেখা যায়, গৌরিপুর, বৌরাণী, কুমিল্লাহাড়ীসহ কয়েকটি গ্রামে। দৌলতপুর গ্রামের দিনমজুর সিরাজুল বলেন, গরিব মানুষের কথা কে শুনবে। খামারের গন্ধের কথা বলতে গেলেই বিপদে পড়তে হয়। তার পর মালিক হচ্ছেন ‘বেনজীর সাহেব। জগন্নাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন আলাল বলেন, দুর্গন্ধে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে দৌলতপুর ও গৌরীপুর মৌজার কয়েক এলাকার মানুষ। আর লাভবান হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এই ব্যক্তিরা প্রচন্ড শক্তিশালী, হাত অনেক লম্বা। তাই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। তিনি জানান, ভুক্তভোগীরা সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেও প্রতিকার পাননি। পরে তারা আন্দোলনেও নেমেছিলেন। সেই আন্দোলন দমাতে ওই খামারে ছুটে এসেছিলেন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ। তিনি ২০১৮ সালে আকাশপথে ঠাকুরগাঁওয়ে আসেন। তাকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি সদর উপজেলার বড়খোচাবাড়ি এস কে দৌলতপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অবতরণ করে। সেখান থেকে গাড়িতে চড়ে খামারে যান। তখন থেকে এই খামারের নাম পড়ে ‘বেনজীরের খামার’। এই খামারের ব্যবস্থাপক ডা. ফেরদৌস আলম। তিনি খামার থেকে দুর্গন্ধ ছড়ানোর বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘গন্ধ যাতে খামারের বাইরে না যায়, সে ব্যবস্থা তাদের নেওয়া আছে। বিষ্ঠা থেকে সার উৎপাদন করা হচ্ছে।’সাবেক আইজিপি বেনজীর খামারটির মালিক কি না, জানতে চাইলে এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে দাবি করেন ডা. ফেরদৌস। তবে বেনজীর আহমেদ ওই খামারে গিয়েছিলেন বলে নিশ্চিত করেন তিনি। খামার পরিচালনায় পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র আছে কি না জানতে চাইলে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘খোঁজ নিয়ে জানতে হবে।’

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!