শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৮ ফাল্গুন ১৪৩২

এবার সৌদিফেরত তরুণীর না জানা গল্প

আইন-অপরাধ ডেস্ক

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৬, ০২:০২ পিএম

এবার সৌদিফেরত তরুণীর না জানা গল্প

ডেইলি খবর ডেস্ক: নিরাপদ জীবনের স্বপ্ন গড়তে বছরখানেক আগে অনেক বড় স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরব গিয়েছিলেন বরিশালের এক তরুণী। ভাগ্য বদলের পরিবর্তে চারবার পাচার চক্রের খপ্পরে পড়েন তিনি। নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বারবার। সৌদি পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারেও পাঠায়। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় পাঁচ মাস বন্দি ছিলেন দেশটিতে। ৯ ফেব্রুয়ারি তাঁকে ফেরত পাঠানো হয় বাংলাদেশে। বর্তমানে রাজধানীর আশকোনায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে আছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সেখানে সমকালের সঙ্গে নিজের জীবনের দুর্বিষহ ঘটনার চিত্র তুলে ধরেন ওই তরুণী। 
তিনি বলেন, ‘আমার জীবনে কোনো আশা নেই। বেঁচে রয়েছি এই তো বড়। অনাগত সন্তানকে দত্তক দিতে চাই। সন্তানকে পৃথিবীর মুখ দেখিয়ে তাকে লালন-পালন করে বড় করার মতো আর্থিক অবস্থা নেই। গন্তব্য জানা নেই আমার।’ 
জানা গেল, শৈশবে বাবাকে হারিয়েছেন তিনি। এরপর তাঁর মা অন্যত্র বিয়ে করেন। এ কারণে তাঁকে এতিমখানায় দেওয়া হয়েছিল। এতিমখানা থেকে এনে রাজধানীর রামপুরায় একটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজে দেওয়া হয় তাঁকে। স্বামী মারা গেছেন। এক ছেলে ও এক মেয়ে তাঁর। ৯ বছরের ছেলেকে শ্বশুরবাড়ির লোকজন নিয়ে গেছে। রামপুরায় যে বাসায় থাকতেন তারা ওই তরুণীর সাত বছরের মেয়েকে দত্তক দিয়েছেন অন্যত্র। এমন অবস্থায় রামপুরার সেই বাসার লোকজন তাঁকে সৌদি আরবে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। 
তরুণী জানান, ঢাকা থেকে যাওয়ার আগে বলা হয়েছিল, তাঁকে কোম্পানিতে কাজ দেওয়া হবে। তবে সৌদিতে যাওয়ার পর তাঁকে মদিনায় একটি বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ দেওয়া হয়। সেখানে তাঁকে ঠিকঠাক খাবার দেওয়া হতো না। মাঝে মাঝে মারধর করা হতো। মাসখানেক কাজ করার পর বেতন চাইলে বলা হয়, তিন মাসের অগ্রিম বেতন দিয়ে তাঁকে কাজে নেওয়া হয়েছে। দালালরা সেই টাকা নিয়ে গেছে। এটা জানার পর হতাশ হয়ে পড়েন তিনি। 
মাস চারেক পর ওই বাসা থেকে পালিয়ে বেরিয়ে যান। এর পর মদিনায় বাঙালি এক নারীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তিনি তাঁকে জেদ্দায় নিয়ে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। এতে রাজি হওয়ার পর বাঙালি একজন প্রাইভেটকার চালকের মাধ্যমে তাঁকে জেদ্দায় পাঠানো হয়। সেখানে গিয়ে তরুণীকে একটি বাসায় রাখা হয়। ওই বাসায় আগে থেকে আরও তিনজন বাঙালি নারী ছিলেন। দু-তিন দিন পার হওয়ার পর ওই চালকের কাছে জানতে চান– কোন বাসায় তাঁকে গৃহকর্মীর কাজ করতে হবে। তখন তিনি জানতে পারেন, নারী পাচার চক্রের খপ্পরে পড়েছেন তিনি। দেশে ফেরত আসতে চাইলে তিন হাজার দিরহাম দাবি করে তারা। সেটি দেওয়া হলে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হবে। এক পর্যায় ঢাকায় আত্মীয়দের কাছে ফোন করে টাকার ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এত টাকা জোগাড় করার মতো অবস্থা তাদের নেই জানানোর পর তরুণীকে বলা হয়, ‘তিন থেকে চার মাস তাদের কথামতো চললে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হবে।’ প্রতারণার শিকার হয়ে তাদের জালে আটকা পড়েন তিনি। এর পর জেদ্দা থেকে তাঁকে মক্কায় নেওয়া হয়। সেখানে গিয়ে একই ধরনের আরেক চক্রের হাতে পড়েন।পাকিস্তানি এক গাড়িচালক তাঁকে কয়েক দফায় নির্যাতন করেন। 
তরুণী জানান, এক পর্যায়ে সৌদি আরবে পুলিশের কাছে গিয়ে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করার অনুরোধ করেন। পুলিশ তাঁর বায়োমেট্রিক পরীক্ষার পর জানতে পারে,মদিনায় যে বাসা থেকে তিনি পালিয়েছেন, সেই বাসার লোকজন আগেই থানায় অভিযোগ দিয়েছে। এ ছাড়া শারীরিক পরীক্ষার পর জানা গেল, তিনি অন্তঃসত্ত্বা। এর পর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। 
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান সমকালকে বলেন, নিয়োগ কর্তৃপক্ষ ও নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে নির্যাতনের শিকার তরুণীদের দেশে ফেরত পাঠানো অনাকাঙ্ক্ষিত। এটি এর আগেও ঘটেছে। দেশে ফেরার পর তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো রাষ্ট্রীয় কোনো কাঠামো তৈরি হয়নি। তরুণীকে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করছি আমরা।সংগৃহীত
 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!