ডেইলি খবর ডেস্ক: জনপ্রিয়তার দীর্ঘ অধ্যায়কে পুঁজি করে তিনি ধাপে ধাপে গড়ে তুলেছেন এক রাজনৈতিক কাঠামো। এখন সেই কাঠামোই তাঁকে নিয়ে যাচ্ছে ক্ষমতার কেন্দ্রের দোরগোড়ায়। তিনি দক্ষিণী সিনেমার সুপারস্টার থালাপতি বিজয়। এই যাত্রা শুধু তার ব্যক্তিগত রূপান্তর নয় বরং তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক সমীকরণে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে।
তামিলনাড়ুর রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই উত্থান কেবল নতুন নয়বরং ব্যতিক্রমী। কারণ দক্ষিণ ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেখানে তারকারা সাধারণত ধীরে ধীরে দ্বিধা নিয়ে ধাপে ধাপে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন সেখানে বিজয় বেছে নিয়েছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশল পরিকল্পিত, স্তরভিত্তিক এবং লক্ষ্যনির্ভর রূপান্তরের পথ।
সংক্ষিপ্ত তবুও সুসংগঠিত যাত্রা-সময়ের হিসেবে স্বল্প হলেও সাংগঠনিক কাঠামো ও কৌশলগত বিস্তারের দিক থেকে অত্যন্ত সুসংগঠিত।
এক নতুন রাজনৈতিক শক্তির এই যাত্রার সূচনা ২০০৯ সালে। তখনই বিজয় তাঁর বিশাল ফ্যানবেসকে একত্র করে গঠন করেন ‘বিজয় মাক্কাল লায়াক্কাম’। শুরুতে এটি ছিল সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও কল্যাণমূলক প্ল্যাটফর্ম।তবে এখানেই ছিল কৌশলগত দূরদৃষ্টি।
ত্রাণ কার্যক্রম, শিক্ষাসহায়তা এবং স্থানীয় সমস্যায় সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে সংগঠনটি ধীরে ধীরে গ্রাম, শহর, ওয়ার্ড থেকে বুথ পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত ভিত্তি গড়ে তোলে। এই সামাজিক উপস্থিতিই পরবর্তীতে রূপ নেয় রাজনৈতিক পুঁজিতে।
যে পরীক্ষা ভবিষ্যতের পথরেখা আঁকে-বিজয়ের সংগঠন ২০১১ সালে প্রকাশ্যে এআইএডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোটকে সমর্থন জানায়। এটি ছিল বিজয়ের প্রথম স্পষ্ট নির্বাচনী অবস্থান।
এই পদক্ষেপ শুধু রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করেনি বরং একটি গভীর প্রশ্ন সামনে আনেতারকার জনপ্রিয়তা কি বাস্তব ভোটে রূপান্তরিত হতে পারে? এই পরীক্ষাই ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পথরেখা নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সিনেমার সংলাপেই রাজনীতির সুর-সিনেমা জগতে তুমুল জনপ্রিয়তা পাওয়া বিজয় ২০১০-এর শেষভাগ থেকে জনসমক্ষে নিজের উপস্থিতির ভাষা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। অডিও লঞ্চ, ফ্যান মিট, সামাজিক অনুষ্ঠানসব ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক ইঙ্গিত স্পষ্ট করে তোলেন।
পরীক্ষার চাপ, যুব বেকারত্ব, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতাএই ইস্যুগুলো তাঁর বক্তব্যে ক্রমশ কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে। ২০১৯ সালে ‘সিটিজেনশিপ এমেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট’-এর সমালোচনা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে আরো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। তখন থেকেই তিনি কেবল অভিনেতা নন—বরং একটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক কণ্ঠে পরিণত হয়ে উঠেন।
ভক্তের ভক্তি থেকে ভোটের মাঠ দখল-দল ঘোষণার আগেই সংগঠনের রাজনৈতিক শক্তি বাস্তবে পরীক্ষিত হয়। ২০২১ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিজয়ের সংগঠনটির প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে জয় লাভ করেন। এই ফলাফল ছিল একটি স্পষ্ট টার্নিং পয়েন্ট। এই সংগঠন যে কেবল জনসমাগম নয় বরং নির্বাচনী ফলাফল প্রভাবিত করার সক্ষমতাও রাখে সেটি প্রমাণ করে দেয়।
রাজনৈতিক মঞ্চে আনুষ্ঠানিক প্রবেশ-অবশেষে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিজয় আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করেন ‘টিভিকে’ দলটি। দল ঘোষণার সময়ই তিনি রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেন২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দল এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, কোনো প্রাক-নির্বাচনী জোটে যাবে না এবং ডিএমকে-এআইএডিএমকে-এর দ্বৈত আধিপত্যের বাইরে একটি স্বাধীন বিকল্প হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করবে। এমন অবস্থান তাঁকে প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে এক স্বতন্ত্র অবস্থানে দাঁড় করায়।
রূপালি পর্দার ইতি টেনে রাজনীতির ময়দানে-রাজনীতিতে প্রবেশের পরপরই বিজয় তাঁর তিন দশকের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারের ইতি টানার ঘোষণা দেন। প্রায় ৭০টি চলচ্চিত্রের পর এই সিদ্ধান্ত ছিল কেবল প্রতীকী নয়—বরং একটি রাজনৈতিক বার্তা।
এটি স্পষ্ট করে দেয়, রাজনীতি তাঁর কাছে কোনো পার্শ্বচর্চা নয়; বরং পূর্ণকালীন প্রতিশ্রুতি।
দুই বছরেই শূন্য থেকে শক্তির সাম্রাজ্যে-২০২৪ থেকে ২০২৬এই দুই বছরেই বিজয়ের দলটি একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক কাঠামোয় রূপ নেয়।
জেলা কমিটি, বিধানসভা ইউনিট, বুথ-স্তরের সংগঠনসবই গড়ে ওঠে সুপরিকল্পিত, কর্পোরেট-ধাঁচের ব্যবস্থাপনায়। দলের মূল বার্তা দাঁড়ায় শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার ওপর।এই কাঠামোয় বিজয়কে প্রচলিত রাজনৈতিক বক্তা হিসেবে নয় বরং একজন ‘শ্রোতা’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে—যা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও জনসভায় নতুন ধরনের রাজনৈতিক যোগাযোগ তৈরি করে।
প্রথম পরীক্ষায় প্রশ্নের মুখে সাংগঠনিক সক্ষমতা-বিজয়ের বর্তমান অবস্থানের এই যাত্রাপথ পুরোপুরি মসৃণ ছিল না। ২০২৫ সালে একটি দলীয় অনুষ্ঠানে প্রাণঘাতী পদদলনের ঘটনা সংগঠনের জন্য প্রথম বড় সংকট হয়ে ওঠে।
এই ঘটনায় সংগঠনগত শৃঙ্খলা, ব্যবস্থাপনা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তবে বিজয়ের পরিমিত ও নিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া নেতৃত্বের এক ভিন্ন দিক তুলে ধরে। সংকট মোকাবিলায় সংযম ও সংশোধনের অবস্থানেরও জানান দেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী কিংবা সরকারের অপরিহার্য শক্তি-বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায়, যদি বিজয়ের দল ১১০টি আসন অর্জন করে, তবে তিনি হয়ে উঠবেন সরকার গঠনের কেন্দ্রীয় চরিত্র। তিনি হয়তো মুখ্যমন্ত্রী হবেন, নয়তো এমন এক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবেন যাকে বাদ দিয়ে সরকার গঠন কার্যত অসম্ভব। তবে প্রাক-নির্বাচনী জোট প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের জোট রাজনীতিকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলবে।
ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাজনীতির নতুন মোড়-বিজয়ের দল টিভিকে-এর উত্থানে তামিলনাড়ুর রাজনীতি এখন এক নতুন ত্রিমুখী সমীকরণের দিকে এগোচ্ছে।
ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে-এর পাশাপাশি এখন তৃতীয় শক্তি হিসেব নিজের জানান দিচ্ছে টিভিকে। এই পরিবর্তন অনেকটাই স্মরণ করিয়ে দেয় গ. এ. জধসধপযধহফৎধহ-এর উত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্গঠনের সময়কে, যখন রাজনীতির কাঠামো আমূল বদলে গিয়েছিল।এমন বিস্ময়কর ব্যাপার মনে করিয়ে দেয় রুপালী পর্দায় রাজত্বের পাশাপাশি রাজনীতির ময়দানেও সফল এমজি রামাচন্দ্রনের উত্থানের পরবর্তী সময়কে। যখন রাজনীতির কাঠামো আমূল বদলে গিয়েছিল।
দুই যুগের দুই তারকাএমজিআর বনাম বিজয়-এমজি রামাচন্দ্রনের সঙ্গে বিজয়ের তুলনা অনিবার্য হয়ে উঠেছে। তবে তাদের পার্থক্যও স্পষ্টএমজিআর উঠে এসেছিলেন নাটকীয় রাজনৈতিক বিভাজন ও জনমুখী কল্যাণনীতির মাধ্যমে।
অন্যদিকে বিজয়ের উত্থান নতুন প্রজন্মের নানা সমস্যা, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে।
ইতিহাস বদলের দ্বারপ্রান্তে তামিলনাড়ু-এই নির্বাচন রাজনৈতিক ভাষার রূপান্তরের দিকে ধাবিত করছে তামিলনাড়ুকে। প্রায় পাঁচ দশকের মধ্যে প্রথম অভিনেতা হিসেবে ফোর্ট সেন্ট জর্জে প্রবেশ করবেন বিজয়। নয়তো তিনি প্রমাণ করবেন—এই সম্ভাবনা এখন আর কল্পনা নয়, বরং বাস্তব হওয়ার অপেক্ষা মাত্র। যে ফলই আসুক একটি বিষয় স্পষ্টএই উত্থান ইতোমধ্যেই ইতিহাসের অংশ। ছবি-সংগৃহীত,সূত্র : এনডিটিভি

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :