বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

সারাদেশে শিক্ষকদের আন্দোলনে অচল প্রায় উচ্চশিক্ষা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: জুলাই ২, ২০২৪, ০৯:৩৩ এএম

সারাদেশে শিক্ষকদের আন্দোলনে অচল প্রায় উচ্চশিক্ষা

দেশের সর্বজনীন পেনশনের সদ্য চালু হওয়া ‘প্রত্যয়’ স্কিম বৈষম্যমূলক অভিহিত করে আন্দোলনে নেমেছেন সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।বেতন স্কেলের গ্রেড সমস্যা নিয়ে ২০১৬ সালে কর্মবিরতি পালন করেছিলেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। ৮ বছর পর আবার সর্বাত্মক কর্মবিরতি শুরু করলেন তাঁরা। এবার তাঁদের দাবি সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রত্যয় স্কিম’ বাতিলসহ তিনটি। তাঁদের আন্দোলনে এবার যুক্ত হয়েছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। এতে অচল হয়ে পড়েছে সারাদেশের উচ্চশিক্ষা কার্যক্রমের প্রায় পুরোটা। 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ জুলাই সোমবার কর্মবিরতি পালন করা হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হয়নি ক্লাস-পরীক্ষা ও দাপ্তরিক কার্যক্রম। বন্ধ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারও। আন্দোলনকারীরা বলছেন,প্রত্যয় স্কিম-সংক্রান্ত ‘বৈষম্যমূলক প্রজ্ঞাপন’ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত চলবে সর্বাত্মক কর্মবিরতি। এই অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজট সৃষ্টি আশঙ্কা করছেন শিক্ষাবিদ ও শিক্ষার্থীরা। 
তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন শিক্ষকনেতারা। কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি শিক্ষামন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরীও। তিনি  বলেন, ‘এখনই কোনো মন্তব্য করব না, সময় হোক। এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের মহাসচিব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি নিজামুল হক ভূইয়া বলেন, ‘এখন পর্যন্ত সরকারের কোনো সাড়া পাইনি। তবে আমরা আশাবাদী, দ্রæততম সময়ের মধ্যে সরকার আমাদের দাবি মেনে নেবে। গত ৬ এপ্রিল প্রত্যয় স্কিমের প্রজ্ঞাপন বাতিলসহ তিন দফা বাতিলের দাবিতে ১ জুলাই থেকে সর্বাত্মক কর্মবিরতিতে যাওয়ার ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন। এর বাইরে সুপার গ্রেডে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তি ও তাঁদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল প্রবর্তনেরও দাবিও শিক্ষকদের। এরই ধারাবাহিকতায় গত কয়েক মাসে কর্মসূচি পালন করছেন তাঁরা। জানা যায়, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৫৫টি, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকসংখ্যা সাড়ে ১৬ হাজার, আর কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন ৩৪ হাজার ৩৮২ জন। 
সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয় গত বছরের ১৭ আগস্ট। বর্তমানে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় মোট পাঁচটি কর্মসূচি (স্কিম) রয়েছে। এগুলো হলো প্রগতি, সুরক্ষা,প্রবাস, সমতা ও প্রত্যয়। এর মধ্যে প্রত্যয় স্কিমে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন সব ধরনের স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় সংস্থা এবং তাদের অধীনস্থ অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলো। 
সারা দেশ থেকে প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে জানা যায়, শিক্ষকদের কর্মবিরতিতে অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ও প্রফেশনাল কোর্সে অনলাইনে বা সরাসরি কোনো ক্লাস-পরীক্ষা হয়নি। বন্ধ ছিল দাপ্তরিক কার্যক্রমও। সব মিলিয়ে কর্মবিরতিতে অচল হয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এতে বিপাকে পড়েন শিক্ষার্থীরা। দ্রæত স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার দাবি জানান তাঁরা।  বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নানসহ একাধিক প্রফেসর বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকলে সেশনজট বাড়বে। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হবে শিক্ষার্থীরা। সবার প্রতি আহ্বান জানাই, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির দ্রæত সুরাহা করা হোক।’ 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ১ জুলাই সকাল থেকে সর্বাত্মক কর্মবিরতি শুরু করেন শিক্ষকেরা। অনুষদ ও ইনস্টিটিউটগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের তেমন উপস্থিতি দেখা যায়নি। ক্লাস-পরীক্ষাও হয়নি। ক্যাম্পাসজুড়ে পালিত হচ্ছে শিক্ষক সমিতির কর্মসূচি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারও বন্ধ ছিল। 
দাবি আদায়ে পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালন করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষকেরা। দুপুর ১২টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচিও পালন করেন তাঁরা। একইভাবে সকাল থেকে সর্বাত্মক কর্মবিরতি পালন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ক্লাসে ফিরবেন না বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মোতাহার হোসেন। ২ জুলাই মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসার সমিতি ও কর্মচারী সমিতি ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন ও কর্মবিরতি পালন করবে বলে জানিয়েছেন অফিসার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিম মিয়া। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও ১ জুলাই বেলা ১১টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সিনেট ভবনসংলগ্ন প্যারিস রোডে তাঁদের কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১ ঘণ্টা অবস্থান করেন।চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষক সমিতি, অফিসার সমিতি ও কর্মচারী ইউনিয়ন কর্মবিরতি পালন করেছে। এতে ক্লাস, পরীক্ষা ও সব দাপ্তরিক কাজ বন্ধ ছিল। 
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা সর্বাত্মক কর্মবিরতি পালন করেন। ১ জুলাই সকালে একাডেমিক ভবনগুলো খুললেও দুপুর ১২টা পর্যন্ত কোনো শিক্ষার্থীকে দেখা যায়নি। অধিকাংশ শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষার কক্ষ তালাবদ্ধ ছিল। কর্মচারীরা উপস্থিত থাকলেও অলস সময় পার করেন। 
একইভাবে দাবি আদায়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মবিরতি কর্মসূচি পালন করা হয়। এ ছাড়া বুয়েট, খুলনা, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বাংলাদেশ কৃষি, খুলনা কৃষি, হাজী দানেশ, কুয়েট, রুয়েটসহ অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা কর্মবিরতি পালন করেন। 
প্রত্যয় স্কিম নিয়ে আপত্তি নিয়েমশিক্ষকেরা বলছেন, প্রত্যয় স্কিমে মূল বেতন থেকে ১০ শতাংশ বা সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা (যেটি সর্বনিম্ন) কেটে রাখার কথা বলা হয়েছে, যা বর্তমান পেনশন ব্যবস্থায় নেই। এ ছাড়া প্রত্যয় স্কিমে আনুতোষিকও শূন্য। বর্তমানে পেনশনার ও নমিনি আজীবন পেনশনপ্রাপ্ত হন; কিন্তু প্রত্যয় স্কিমে পেনশনাররা ৭৫ বছর পর্যন্ত পেনশন পাবেন। বিদ্যমান পেনশন ব্যবস্থায় ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট পাওয়া যায়, সর্বজনীন পেনশনের প্রত্যয় স্কিমে তা উল্লেখ নেই। এর বাইরে প্রত্যয় স্কিমে পেনশনধারীদের বয়সসীমা ৬০ বছর রাখা হয়েছে, যদিও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা অবসরে যান ৬৫ বছরে। আর বর্তমান পেনশন ব্যবস্থায় এককালীন বিশাল অঙ্কের অর্থ পাওয়া যায়, যা প্রত্যয় স্কিমে সম্ভব নয়।

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!