মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

এবার সাগরতলে স্থায়ী এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ০৯:৪৬ এএম

এবার সাগরতলে স্থায়ী এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব

ডেইলি খবর ডেস্ক: দেশে গ্যাস সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছে না। আর অনেক এলাকায় আবাসিক গ্রাহকদের কম চাপের গ্যাস নিয়ে ভোগান্তি বাড়ছেই। এমন পরিস্থিতিতে বঙ্গোপসাগরে প্রায় ৯৫০ মিলিয়ন ডলার (১১ হাজার কোটি টাকারও বেশি) ব্যয়ে একটি স্থায়ী এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব এসেছে। সরকারের কাছে এটি গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সম্ভাব্য একটি উপায় হলেও জ্বালানি বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নতুন এ প্রকল্প দেশের আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়াতে পারে।

রাশিয়ার জ্বালানি কোম্পানি নোভাটেক মিডল ইস্ট সম্প্রতি পেট্রোবাংলার কাছে গ্র্যাভিটি বেইজড স্ট্রাকচার (জিবিএস) এলএনজি টার্মিনালের একটি প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছে। কোম্পানিটির দাবি, ভাসমান টার্মিনালের তুলনায় এটি হবে অধিক স্থিতিশীল, দীর্ঘস্থায়ী এবং আবহাওয়াজনিত ঝুঁকিমুক্ত অবকাঠামো। তবে প্রকল্পটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধানের গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে এবং এলএনজি আমদানিতে সরকারের ব্যয় রেকর্ড পরিমাণে বাড়ছে।

দেশে বর্তমানে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে। এ ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানি এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রথম এলএনজি আমদানি শুরু করে। তখন জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার ৮৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। সর্বশেষ অর্থবছরে সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৮১ হাজার ৮৭৪ মিলিয়ন ঘনফুটে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয়ও কয়েক গুণ বেড়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার কারণে এ ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এলএনজি নির্ভরতার আরেকটি বড় দিক হলো ভর্তুকি। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট দুই মাসে এলএনজি খাতে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় ছিল প্রায় ৫০০

কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ভর্তুকির চাপ বেড়েছে প্রায় ৯ গুণ। চলতি অর্থবছরে এলএনজি খাতে মোট ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে ১১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ফলে নতুন এলএনজি অবকাঠামো নির্মাণের সিদ্ধান্ত আর্থিকভাবে কতটা টেকসই হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

কী এই জিবিএস টার্মিনাল? বর্তমানে মহেশখালীতে সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জির দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। এগুলো সমুদ্রে নোঙর করা অবস্থায় এলএনজি গ্রহণ করে গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে।

অন্যদিকে জিবিএস বা গ্র্যাভিটি বেইজড স্ট্রাকচার টার্মিনাল হবে সমুদ্রতলে স্থায়ীভাবে স্থাপিত কংক্রিট কাঠামো। এর ওপর থাকবে এলএনজি সংরক্ষণ, রিগ্যাসিফিকেশন এবং গ্যাস সরবরাহের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা।

নোভাটেক তাদের প্রস্তাবে বলেছে, সমুদ্রের তলদেশে বসানো বিশাল কংক্রিটের কাঠামোর ওপর তৈরি হবে স্থায়ী টার্মিনাল। ফলে এটি ভাসমান টার্মিনালের মতো ঢেউ বা ঝড়ের সঙ্গে দুলবে না। জিবিএস টার্মিনালে এক মাসের গ্যাসের মজুত রাখা যাবে। এখান থেকে ছোট কার্গোতে করে এলএনজি দেশের আরও চারটি স্থানে সরবরাহ করার কথা বলা হয়েছে এই প্রস্তাবে। ফলে এটি হবে এলএনজি গ্রহণ, সংরক্ষণ ও গ্যাস সরবরাহের একটি বড় অবকাঠামো। বড় আকারের এলএনজি জাহাজ সরাসরি সেখানে এসে খালাস করতে পারবে।

এই এলএনজি ব্যবস্থাপনায় দুটি পদ্ধতির কথা বলেছে নোভাটেক। প্রথম পদ্ধতিতে এলএনজি পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে সমুদ্রের নিচ দিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। আর দ্বিতীয় পদ্ধতিতে এলএনজি তরল অবস্থায় ছোট জাহাজে করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হবে। এতে নতুন গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের প্রয়োজন অনেকটাই কমে আসবে।

নোভাটেক দেশের অভ্যন্তরে প্রায় ৫ হাজার ঘনমিটার এলএনজি বহন করতে সক্ষম ছোট জাহাজ ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছে। এসব জাহাজে করে নদীপথে এলএনজি পরিবহনের জন্য চারটি রুট যথা নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাট, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ, নরসিংদীর ঘোড়াশাল ও কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এসব জায়গায় ছোট আকারের রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট স্থাপন করে সমুদ্রবন্দর থেকে এলএনজি সরাসরি বড় পাইপলাইনের মাধ্যমে না নিয়ে নদীপথে ছোট জাহাজে করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। পরে এসব এলাকায় এলএনজি গ্যাসে রূপান্তর করে স্থানীয় শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা ও ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টে সরবরাহ করা যাবে।

ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য সাধারণত ৫০০ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হয়। এ ধরনের টার্মিনালের সঙ্গে সরকার ১৫ বছরের গ্যাস সরবরাহ চুক্তি করে। অন্যদিকে নোভাটেক ৯৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা বলছে। এ ধরনের টার্মিনাল ৬০ থেকে ৮০ বছর গ্যাস সরবরাহ করতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ঝড়ঝঞ্ঝার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ভাসমান টার্মিনালে এলএনজি খালাস বাধাগ্রস্ত হয়। সম্প্রতি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি জটিলতার কারণে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এতে সারা দেশে গ্যাসচাপ হ্রাস পায়, বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গিয়ে শিল্পখাতে উৎপাদন ব্যাহত হয়। এ ধরনের পরিস্থিতি দেখিয়েছে যে, মাত্র দুটি ভাসমান টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীলতা ঝুঁকিপূর্ণ। নতুন অবকাঠামো যোগ হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিকল্প তৈরি হবে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না করে কেবল এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের পথ বেছে নিলে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে আরও বেশি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে। সরকার এরই মধ্যে মাতারবাড়িতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। নতুন কোনো প্রকল্প অনুমোদনের আগে জাতীয় গ্যাস চাহিদা, সম্ভাব্য দেশীয় উৎপাদন, আমদানি ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশল বিবেচনায় নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য সরকারের উচিত ব্যয়বহুল জ্বালানি প্রকল্প গ্রহণ না করা। সরকার এ প্রকল্প গ্রহণ করবে নাকি করবে না, সেটা সরকারের সিদ্ধান্ত। তবে জ্বালানি পণ্যকে কীভাবে আরও জনবান্ধব ও সহজলভ্য করা যায়, সেদিকটা বিবেচনা করতে হবে।

সার্বিক বিষয়ে পেট্রোবাংলার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, নোভাটেক আমাদের এখানে প্রেজেন্টেশন দেওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি মন্ত্রণালয়েও একটা প্রেজেন্টেশন দিয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় এখনো এ বিষয়ে কোনো রেসপন্স করেনি। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত না পাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে আমাদের করার কিছু নেই।ছবি-সংগৃহীত, সুত্র-কালবেলা

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!