মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩

রংপুরে ৪ হত্যাকান্ডের পুলিশের বয়ান ঘিরে নানা প্রশ্ন-আন্দোলন, থানা থেকে মামলার তদন্তভার ডিবিতে

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ২৫, ২০২৬, ০৯:২২ এএম

রংপুরে ৪ হত্যাকান্ডের পুলিশের বয়ান ঘিরে নানা প্রশ্ন-আন্দোলন, থানা থেকে মামলার তদন্তভার ডিবিতে

আইন-অপরাধ ডেস্ক: রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া বয়ান ঘিরে নানা প্রশ্ন ও অধিকতর তদন্তের দাবির মধ্যেই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বদল করা হয়েছে। কোতোয়ালি থানার পরিবর্তে মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয়েছে মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগকে (ডিবি)।

পুলিশ বলছে, অধিকতর স্বচ্ছ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত এবং দ্রুত চার্জশিট দেওয়ার লক্ষ্যেই তদন্ত সংস্থা পরিবর্তন করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী।

গত ২৪ আগস্ট বিকেলে মামলার আগের তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি ডিবি কার্যালয়ে গিয়ে মামলার নথিপত্র ও প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত নতুন তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক জিন্নাত আলীর কাছে হস্তান্তর করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পরে বিকেলেই পুরোনো ও নতুন দুই তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থল নগরীর মাছুয়াপাড়ায় গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে যান। সেখানে মিলন চ্যাটার্জি ঘটনাস্থলের বিভিন্ন বিষয় নতুন তদন্ত কর্মকর্তাকে অবহিত করেন।

আগের বক্তব্যের সঙ্গে মিল আছে, কিছু বিষয় যুক্তও করেছে-ডিবির উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, রোববার গভীর রাত পর্যন্ত দুই আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আদালত সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আসামিদের বক্তব্য পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে মিল রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা যেটা আদালত সূত্রে জানতে পেরেছি, আসামিরা অ্যাজ ইট ইজ অর্থাৎ আমাদের কমিশনার স্যার ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের যেটা বলেছেন, দেশবাসীকে যেটা জানিয়েছেন, একই ঘটনা তাঁরা বলেছেন। তাঁরা কিছু কিছু ক্ষেত্রে যুক্তও করেছে, যেটা আমাদের বলেনি।’

সনাতন চক্রবর্তী বলেন, মামলাটি এখন ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক জিন্নাত আলীকে তদন্ত কর্মকর্তা করা হয়েছে। পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের জন্যই তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের বয়ান ঘিরে প্রশ্ন, তদন্তভার বদল-এর আগে রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি) মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ দাবি করেন, বাসার ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে। এই বক্তব্যের পর থেকেই হত্যাকাণ্ডের কারণ, পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত এবং ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। নিহত পরিবারের স্বজন, স্থানীয় বাসিন্দা, সচেতন নাগরিক ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকেও অধিকতর তদন্তের দাবি ওঠে। মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশও করেন। এমনকি গ্রেপ্তার দুই তরুণের পরিবারও প্রশ্ন তোলেন তাঁরা দুজনে চারজনকে কীভাবে খুন করেন। এর পেছনে কারা জড়িত তা খুঁজে বের করার দাবি তোলেন। এর মধ্যেই মামলার তদন্তভার থানার কাছ থেকে ডিবিতে দেওয়া হলো।

রংপুরে ৪ খুন: মালিক নেই, তবু ছাদ ছাড়েনি কবুতরগুলোরংপুরে ৪ খুন: মালিক নেই, তবু ছাদ ছাড়েনি কবুতরগুলো
পুলিশের ভাষ্য, নতুন তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাটির প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখবেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেবেন।

যে রাতে নিভে যায় একটি পুরো পরিবার-রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যান। নগরীর বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকলেও মাছুয়াপাড়া এলাকায় জমি কিনে দোতলা বাড়ি নির্মাণ করেন। প্রায় দুই-তিন বছর ধরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ওই বাড়ির দোতলায় বসবাস করছিলেন তিনি। অবসরের পর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবেও রোগী দেখতেন।

গত শনিবার রাতে ওই বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ।

পুলিশ জানিয়েছে, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস ও বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়।

রংপুরে ৪ জনকেই শ্বাসরোধে হত্যা, পচনের কারণে মুখ বীভৎস: ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরংপুরে ৪ জনকেই শ্বাসরোধে হত্যা, পচনের কারণে মুখ বীভৎস: ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক
এরপর গত রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে ওই দুই যুবক জানিয়েছেন, ইয়াবা সেবনের উদ্দেশ্যে তাঁরা গণপতির বাড়ির ছাদে উঠেছিলেন। শব্দ শুনে গণপতি সেখানে গেলে তাঁকে হত্যা করা হয়। পরে পরিবারের অন্য তিন সদস্যকেও হত্যা করা হয় বলে পুলিশের ভাষ্য।

তবে পুলিশের এ বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের দাবি, এত দ্রুত তদন্তের একটি পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার বিষয়টি তাঁদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। সেখানে অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। যে ভবন ব্যবহার করে গণপতির ছাদে উঠেছিল সেই ছাদে তাঁদের জন্য নিরাপদ ছিল ইয়াবা সেবনের, কিন্তু তাঁরা ঝুঁকি নিয়ে কেন গণপতির ছাদে গেল? গণপতির ছাদেই যদি ইয়াবা সেবন করতে যায় তাহলে বিদ্যুৎ সংযোগ কখন, কেন বিচ্ছিন্ন করল?

ঘুমন্ত প্রিয়মকে হত্যার কারণ কী? সিদ্ধার্থের বাসা গণপতির ভবনের প্রাচীর লাগোয়া তাহলে হত্যার পর তাঁরা নিরাপদে সেখানে যেতে পারতেন, কিন্তু কেন তাঁরা দীর্ঘ সময় ঘটনাস্থলে অবস্থান করলেন? সিদ্ধার্থের বন্ধু গণপতির পাশের বাড়ি সীমান্তের বাড়িতে যদি তাঁরা ইয়াবা সেবন করে থাকেন, তাহলে গণপতির ছাদে যেতে হলো কেন? প্রথমে ডাকাতির কথা বলা হলেও পরে মাদককে সামনে আনা হয়েছে। মাদকের কারণে নাকি পরিকল্পিত হত্যা, ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ বা আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানান।সংগৃহীত ছবি

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!