ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি: দেশের অন্যতম আম চাষের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের মৌসুম এলেই শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়। বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও জেলায় এই খাতকে ঘিরে গড়ে ওঠেনি কোনো প্রক্রিয়াজাত শিল্প। ফলে অর্থনৈতিকভাবে কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষক ও উদ্যোক্তারা।সংশ্লিষ্টদের মতে, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে প্রতিবছর বিপুল আম নষ্ট হয়ে যায়। এসব আমকে যদি শিল্পকারখানার মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করা যায়, তাহলে একদিকে অপচয় কমত, অন্যদিকে নতুন কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হতো।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আমের চাষাবাদ হয়েছে। যার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ টন।জানা যায়, জেলার হাজার হাজার পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আম চাষ, বিপণন ও পরিবহনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু মৌসুম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক কৃষকের মুখে নেমে আসে হতাশা। চাষিদের অভিযোগ, প্রতিবছর উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে আমের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হয় না। সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি কয়েক গুণ বেড়েছে। কিন্তু আমের দাম সেই তুলনায় বাড়েনি। ফলে লাভের পরিবর্তে অনেক সময় লোকসানের মুখে পড়তে হয় তাদের।
আমচাষিরা জানান, গত এক দশকে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও আমের বাজারদর অনেক ক্ষেত্রে আগের অবস্থানেই রয়েছে। মৌসুমের শুরুতে দাম কিছুটা ভালো থাকলেও সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে ধস নামে। তখন উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হয়।
স্থানীয় কৃষি উদ্যোক্তারা বলেন, দেশে উৎপাদিত আমের একটি বড় অংশ সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রি হয়। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমকে কেন্দ্র করে জুস, পিউরি, পাল্প, আচার, শুকনো আম, ক্যানডি ও অন্যান্য মূল্য সংযোজন পণ্য তৈরি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা হচ্ছে।তারা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে আমভিত্তিক পণ্যের বাজারের আকার কয়েক দশকে ২৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অথচ পর্যাপ্ত কাঁচামাল থাকার সত্ত্বেও বাংলাদেশে এখনো বড় আকারের আম প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে ওঠেনি। জেলায় স্বল্প পরিসরে কয়েকজন উদ্যোক্তা আম থেকে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নিলেও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব, প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং বিনিয়োগ সংকটের কারণে তাঁরা বড় পরিসরে এগোতে পারছেন না। ফলে সম্ভাবনাময় এই খাতটি এখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ, প্রক্রিয়াজাত শিল্প স্থাপন, উন্নত বাজারব্যবস্থা এবং রপ্তানি সুবিধা সম্প্রসারণ করা গেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম খাত নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিত এই জেলার সম্ভাবনা অনেক, তবে সেই সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে রূপ দিতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর বিনিয়োগ। আমকে ঘিরে শিল্প গড়ে উঠলে বদলে যেতে পারে হাজারো কৃষক ও উদ্যোক্তার জীবন। আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন বলেন, আমকে কেন্দ্র করে আধুনিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তুলতে পারলে কৃষক, উদ্যোক্তা ও দেশের অর্থনীতি সমানভাবে উপকৃত হবে। এ জন্য গবেষণা, প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপপরিচালক ড. মো. ইয়াছিন আলী বলেন, জেলায় নিরাপদ ও রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সংরক্ষণ, বিপণন ও রপ্তানি অবকাঠামো উন্নয়ন করা গেলে আম খাত আরও শক্তিশালী হবে।সংগৃহীত ছবি

ডেইলি খবরের সর্বশেষ নিউজ পেতে Google News অনুসরণ করুন।
আপনার মতামত লিখুন :