শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল, ২০২৬, ২০ চৈত্র ১৪৩২

শ্রীমঙ্গলের শিল্পনগরী এখন পরিত্যক্ত জঙ্গলে

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: এপ্রিল ২, ২০২৬, ০৮:১১ পিএম

শ্রীমঙ্গলের শিল্পনগরী এখন পরিত্যক্ত জঙ্গলে

ডেইলি খবর ডেস্ক: সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে ওঠা বিসিক শিল্পনগরী আজ নীরব ও পরিত্যক্ত এক অবকাঠামোয় পরিণত হয়েছে। নির্মাণ শেষ হওয়ার ছয় বছর পরও সেখানে চালু হয়নি একটি শিল্পকারখানাও; উল্টো জঙ্গলে ঢেকে যাচ্ছে প্লট, চুরি হয়ে গেছে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি। উচ্চমূল্য, সেবার অভাব ও প্রশাসনিক জটিলতায় মুখ ফিরিয়েছেন উদ্যোক্তারা। এর ফলে স্থানীয় শিল্পায়নের বড় স্বপ্ন এখন প্রশ্নের মুখে।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় প্রতিষ্ঠিত বিসিক শিল্পনগরী একসময় স্থানীয় শিল্পায়নের বড় আশা জাগিয়েছিল। কৃষিভিত্তিক কাঁচামালকে কেন্দ্র করে এখানে ছোট ও মাঝারি শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখেছিলেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। কিন্তু বাস্তবে সেই স্বপ্ন আজ অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। নির্মাণ শেষ হওয়ার প্রায় ছয় বছর পরও সেখানে একটি শিল্পকারখানাও চালু হয়নি। বর্তমানে শিল্পনগরীটির প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে, আর ভেতরের অধিকাংশ এলাকা জঙ্গলে ঢেকে গেছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, শ্রীমঙ্গলের উত্তরসুর এলাকায় প্রায় ২০ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয় এই বিসিক শিল্পনগরী। প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছিল ২০১২ সালে এবং ২০১৯ সালে তা সম্পন্ন হয়। প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই শিল্পনগরীতে মোট ১২২টি শিল্প প্লট তৈরি করা হয়। পাশাপাশি অফিস ভবন, পাম্প হাউস, কর্মকর্তাদের আবাসিক ভবন, ডাম্পিং ইয়ার্ড ও একটি পুকুর নির্মাণ করা হয়। পরিকল্পনায় ছিল একটি মসজিদও।
প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় শিল্পনগরীতে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগের সুবিধা রাখা হয়েছিল। আশা করা হয়েছিল, আনারস, লেবু, রাবার, বালু ও অন্য স্থানীয় কাঁচামালের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান
গড়ে উঠবে। এতে এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। কিন্তু বাস্তবে এখন শিল্পনগরীর চিত্র একেবারেই ভিন্ন। সরেজমিন দেখা যায়, ভেতরের অধিকাংশ এলাকা ঘন ঝোপঝাড়ে ভরে গেছে। কোথাও কোথাও লতাপাতায় ঢেকে গেছে রাস্তা ও অবকাঠামো। পিচঢালা রাস্তার ফাটল ধরে গজিয়েছে ঘাস। দ্বিতীয় প্রবেশপথ প্রায় অচেনা হয়ে গেছে গাছপালার আড়ালে।
এদিকে গ্যাস সাবস্টেশন, বিদ্যুৎ ট্রান্সফরমারসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম চুরি হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। ড্রেনের ওপরের লোহার জালি, গ্রিল এবং বিভিন্ন ধাতব অংশও আর নেই। ফলে বর্তমানে শিল্পনগরীটিতে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ কার্যত বন্ধ অবস্থায় রয়েছে।
উদ্যোক্তাদের অনেকেই শুরুতে প্লট নিলেও পরে কারখানা স্থাপনে আগ্রহ হারান। ডো ইমপেক্স লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক শামীম আক্তার হোসেন জানান, তিনি প্রায় ১১ লাখ টাকা ব্যয়ে চার হাজার বর্গফুটের একটি প্লট নিয়েছিলেন। কিন্তু নানা জটিলতা ও কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা না পাওয়ায় কারখানা স্থাপন করতে পারেননি। পরে প্লট ফেরত দিলে আংশিক টাকা ফেরত পেলেও বাকি অর্থ আর ফেরত পাননি। এতে তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে জানান।
স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতারাও মনে করছেন, প্লটের উচ্চমূল্য উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করেছে। শ্রীমঙ্গল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন বলেন, শিল্পনগরীর প্লটের দাম আশপাশের জমির তুলনায় অনেক বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগও নিয়মিত না থাকায় অনেক উদ্যোক্তা এখানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখাননি। তিনি মনে করেন, প্লটের মূল্য পুনর্বিবেচনা করা হলে এবং প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে শিল্পনগরীটি আবার সচল হতে পারে।
অন্যদিকে বিসিক কর্তৃপক্ষ বলছে, নতুন করে প্লট বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শ্রীমঙ্গল বিসিক শিল্পনগরীর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মুনায়েম ওয়ায়েছ জানান, বর্তমানে কয়েকটি প্লট নতুন উদ্যোক্তাদের কাছে বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। যারা প্লট নিচ্ছেন তাদের দুই বছরের মধ্যে শিল্পকারখানা স্থাপনের শর্ত দেওয়া হচ্ছে। আগে যারা প্লট নিয়েছিলেন কিন্তু কারখানা স্থাপন করেননি তাদেরও নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, অবকাঠামো উন্নয়নে বড় অঙ্কের ব্যয় হওয়ায় প্লটের মূল্য কিছুটা বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশের অন্যান্য বিসিক শিল্পনগরীতেও এ ধরনের মূল্য নির্ধারণ করা হয়।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে কোটি কোটি টাকার এই প্রকল্প পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়বে। শিল্পনগরীটিকে সচল করতে হলে উদ্যোক্তাদের জন্য বাস্তবসম্মত মূল্য নির্ধারণ, নিরাপত্তা জোরদার এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ সব সুবিধা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে। তবেই হয়তো একদিন জঙ্গলে ঢাকা এই শিল্পনগরী আবার শিল্পের শব্দে মুখর হয়ে উঠবে, শ্রমিকরা তাদেও কাজের সুযোগ।ছবি-সংগৃহীত

 

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!