শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে নতুন সমীকরণ নেপথ্যে চার কারণ

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: জুন ১১, ২০২৬, ০১:৪৭ পিএম

চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে নতুন সমীকরণ নেপথ্যে চার কারণ

ডেইলি খবর ডেস্ক: নতুন সমীকরনে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। এটি পরিচালনা করতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে দেশি, বিদেশি ও বহুজাতিক তিনটি পক্ষ। ভিন্ন ভিন্ন দর দিয়ে দুটি পক্ষ নতুন প্রস্তাব জমা দেওয়ায় পাল্টে গেছে আগের হিসাব-নিকাশ। হঠাৎ এনসিটি নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার নেপথ্যে চারটি কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা। সম্প্রতি বন্দরে বর্ধিত ট্যারিফ কার্যকর হওয়া, ডিপি ওয়ার্ল্ডের এপস্টেইন কেলেঙ্কারিতে যুক্ত হওয়া, সরকারের ধীরে চলো নীতি ও শ্রমিক আন্দোলন তৈরি করছে এমন নতুন আবহ। 
তবে মন্ত্রণালয় বলছে, নিয়ম অনুযায়ী আগে আবেদন করা ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাব অগ্রাধিকার পাবে। সেখানে কোনো সমাধান না এলে নতুন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করবে তারা। তবে মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তে দ্বিমত পোষণ করে ফের আন্দোলনে নেমেছেন শ্রমিক নেতারা। গতকাল বুধবার বিক্ষোভ সমাবেশও করেছেন তারা। চট্টগ্রাম বন্দরে সিসিটি, পিসিটি ও জিসিবি নামে আরও তিনটি টার্মিনাল আছে। তবে বছরে গড়ে ৪৪ শতাংশ কনটেইনার হ্যান্ডল করে শীর্ষে রয়েছে এনসিটি।
নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, ‘এনসিটি নিয়ে একাধিক পক্ষের প্রস্তাব পেয়েছি। তবে আইন ও বিধি মানতে হবে আমাদের। দেশের স্বার্থটাও দেখতে হবে।’ চট্টগ্রাম বন্দরের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত নেবে আমরা সেটিই বাস্তবায়ন করব।’
এনসিটির জন্য কার দর কত
‘সাইফ-কসমস-এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস কনসোর্টিয়াম’ ইজারা না চেয়ে এনসিটি শুধু পরিচালনা করার প্রস্তাব দিয়েছে। সাইফ পাওয়ার টেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন দাবি করেছেন, তাদের প্রস্তাবনা মানলে এনসিটির মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ বন্দরের হাতেই থাকবে। আবার অতিরিক্ত বিনিয়োগ ছাড়াই বন্দর প্রতি একক কনটেইনারে ৯২ ডলার রাজস্ব ধরে রাখতে পারবে। কারণ, বর্তমানে সব খরচ বাদ দিয়ে বন্দরের নিট আয় থাকছে এখন কনটেইনারপ্রতি ১০৫ দশমিক ৬৭ ডলার। প্রতি একক কনটেইনারে বন্দর আয় করে ১৬১ দশমিক ৮২ ডলার। আর ব্যয় করে ৫৬ দশমিক ১৫ ডলার। ক্রমবর্ধমান পরিচালন ব্যয় আমলে নিয়ে তাই পরিচালনা বাবদ বন্দর থেকে ৬৯ ডলার চেয়েছে তিন প্রতিষ্ঠানের নতুন এই জোট।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) কাঠামোয় এনসিটির ইজারা চেয়ে প্রস্তাব দিয়েছে দেশীয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপও। ‘স্ট্রেংথ অব এমজিএইচ প্রপোজাল দ্যান ডিপি ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক এক বিশ্লেষণের উদ্ধৃতি দিয়ে এমজিএইচ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস আহমেদ দাবি করেছেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ে বন্দরকে তারা প্রতি ২০ ফুট এককের কনটেইনারে ৫ ডলার বেশি রাজস্ব দেবে। তারা প্রস্তাবে উল্লেখ করে, প্রতি টিইইউ কনটেইনার থেকে প্রকৃত রাজস্ব ১১৫ ডলারের কম হলে ডিপি ওয়ার্ল্ড বন্দরকে ৫২ ডলার দেবে। তবে একই ক্ষেত্রে এমজিএইচ দেবে ৫৭ ডলার। আবার প্রকৃত রাজস্ব ১১৫ থেকে ১২০ ডলারের মধ্যে হলে ডিপি ওয়ার্ল্ড দেবে ৫৫ দশমিক ৫ ডলার। একই খাতে এমজিএইচ ৬০ দশমিক ৫ ডলার দেবে। আবার ১২০ থেকে ১৬০ ডলার পর্যন্ত প্রতিটি রাজস্ব ধাপে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ে বন্দরকে ৫ ডলার বেশির ভাগ দেবে দেশীয় প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিযোগিতায় যেভাবে যুক্ত তিন পক্ষ
এনসিটি টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করলেও আওয়ামী লীগ সরকার তা চূড়ান্ত করতে পারেনি। দুবাইয়ের প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বসেরা কোম্পানির একটি হওয়ায় অন্তর্র্বতী সরকার এসে ২০২৫ সালে এই আলোচনায় গতি দেয়। জাতীয় নির্বাচনের আগে চুক্তি করতে অনেক তৎপরতাও চালায় তারা। তবে তীব্র শ্রমিক আন্দোলন ও এপস্টেইন কেলেঙ্কারিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের শীর্ষ কর্ণধারের নাম জড়িয়ে পড়ায় চুক্তির প্রক্রিয়া তখন স্থগিত রাখে অন্তর্র্বতী সরকার। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারও গত তিন মাসে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি।
গত তিন মাসে সরকারের এমন ‘ধীরে চলো নীতি’ দেশি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে প্রস্তাব দিতে সহায়তা করে। গত ২৮ এপ্রিল দেশীয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপ এবং তিন প্রতিষ্ঠানের একটি কনসোর্টিয়াম আলাদাভাবে প্রস্তাব জমা দেয় মন্ত্রণালয়ে। কনসোর্টিয়াম করা তিন প্রতিষ্ঠানের নাম হচ্ছে–‘সাইফ-কসমস-এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস কনসোর্টিয়াম’। চিটাগং কনটেইনার টার্মিনালের (সিসিটি) বর্তমান অপারেটর সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেড নতুন এই জোটের নেতৃত্বে রয়েছে। সঙ্গে নেওয়া হয়েছে দুই বার্থ অপারেটর কসমস এন্টারপ্রাইজ ও এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেডকে। কসমস এন্টারপ্রাইজের চেয়ারম্যান হলেন লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের এমপি ও হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান। আর এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হলেন লক্ষ্মীপুর-১ আসনের এমপি শাহাদাত হোসেন সেলিম। 
নেপথ্যে বড় ভূমিকা রাখছে বর্ধিত ট্যারিফ
চট্টগ্রাম বন্দরের ৫৬ সেবায় নতুন বর্ধিত ট্যারিফ কার্যকর হয়েছে ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর। বর্ধিত এই ট্যারিফ এনসিটি নিয়ে বিনিয়োগকারীর মাঝে আগ্রহ বাড়িয়েছে। এ জন্য ট্যারিফ কার্যকর হওয়ার ছয় মাস পরই গত ২৮ এপ্রিল নতুন দুটি পক্ষ বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়ে প্রস্তাব জমা দিয়েছে মন্ত্রণালয়ে। এই ট্যারিফে ৫৬ খাতে গড়ে মাশুল বেড়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ। তবে প্রতি কনটেইনারে এই মাশুল বেড়েছে গড়ে ৩৭ শতাংশ। আগে বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০ ফুট এককের প্রতিটি কনটেইনার থেকে গড়ে মাশুল আদায় করত সাড়ে ১১ হাজার টাকা। নতুন মাশুল কার্যকর হওয়ায় কনটেইনারপ্রতি বাড়তি দিতে হচ্ছে গড়ে পাঁচ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে এখন কনটেইনারপ্রতি গড়ে মাশুল দিতে হচ্ছে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার টাকা। 
যা বলছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি ও সিকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, বন্দর হঠাৎ ৪১ শতাংশ মাশুল বাড়িয়ে দেওয়ায় এর সুফল যাবে টার্মিনাল পরিচালনা করা প্রতিষ্ঠানের কাছে। তার পরও আমরা চাই প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র। তবে দেশের টাকা দেশে থাকছে কিনা, পুনর্বিনিয়োগ হবে কিনা–সেটি নিয়েও ভাবতে হবে। 
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সভাপতি এস এম আবু তৈয়ব বলেন, বিশ্বমানের সেবা পেতে হলে বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান লাগবে। সরকার যে সিদ্ধান্তই নিক না কেন, তা যেন বিচক্ষণ ও দূরদর্শী হয়। 
চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক বোর্ড মেম্বার জাফর আলম বলেন, তৈরি বন্দরে খুব বেশি বিনিয়োগের সুযোগ নেই। নতুন যে বন্দর তৈরি হবে, যেখানে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি বসানোর সুযোগ থাকবে। সেখানে বড় বিনিয়োগ এলে তা সাধুবাদ পেতে পারে। 
আন্দোলনে শ্রমিক নেতারা
এনসিটির আলোচনা থেকে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বাদ দিতে গতকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বরাবরে স্মারকলিপি দিয়েছে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। আন্দোলনে থাকা স্কপের যুগ্ম আহবায়ক এস কে খোদা তোতন বলেন, ‘এনসিটি নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ড সক্রিয় হলে ফের কঠোর আন্দোলনে যাব।’ স্কপের যুগ্ম আহ্বায়ক ইফতেখার কামাল খানের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন টিইউসি চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি তপন দত্ত, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের সভাপতি খোরশেদ আলম, বিএফটিইউসির সাধারণ সম্পাদক কে এম শহিদুল্লাহ প্রমুখ। সুত্র-সমকাল

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!