শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

পানি সংকট পদ্মায় পানি পেতে আর কত অপেক্ষা

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: মে ১৬, ২০২৬, ০৮:৪৪ পিএম

পানি সংকট পদ্মায় পানি পেতে আর কত অপেক্ষা

ডেইলি খবর ডেস্ক: আজ ১৬ মে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস। ১৯৭৬ সালের এই দিনে এশিয়া-আফ্রিকা লাতিন আমেরিকার নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বরখ্যাত মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ডাকে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজশাহী শহরের মাদ্রাসা ময়দানে সমবেত হয়েছিলেন। সেদিন সকাল ১০টায় লাখো জনতার পদযাত্রা শুরু হয়েছিল সেখান থেকে। পরদিন ১৭ মে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে পৌঁছে সমবেত জনতার উদ্দেশে মজলুম জননেতা বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা দেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ এক আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকে ভয় পায় না, কারও হুমকিকে পরোয়া করে না’। সেদিন তার জ্বালাময়ী ভাষণের একপর্যায়ে লাখো জনতার স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে সভাস্থল। আওয়াজ ওঠে, ‘ভেঙে দাও-গুঁড়িয়ে দাও/মরণ বাঁধ ফারাক্কা’।
সেদিনের ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ ষোলোআনা সফল হয়েছিল। তৎকালীন ভারত সরকার বাধ্য হয়েছিল ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন বিষয়ক একটি পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তি করতে। চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে (জানুয়ারি-মে) পানি প্রবাহ কমে গেলেও বাংলাদেশ তার প্রাপ্য অংশের ৮০ শতাংশ পানি প্রাপ্তির একটি গ্যারান্টি ক্লজ ছিল। এরপর হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনকালে চুক্তিটি নবায়ন না হয়ে একটি সমঝোতা স্মারকপত্র স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু তাতে কোনো গ্যারান্টি ক্লজ ছিল না। এরপর ফারাক্কা বাঁধের সর্বনাশা প্রভাবে ভোগতে থাকে এপারের মানুষ। রাজশাহীর পদ্মার তীরে শ্রীরামপুর এলাকায় বাস করেন
আলতাফ হোসেন। ছোটবেলা থেকে নৌকায় ভেসে ভেসে মাছ ধরেন পদ্মায়। কিশোর বয়সে ভাসানীর লংমার্চে তিনিও যোগ দেন। পদ্মায় বসে তিনি বললেন, এখনও মনে হয় ভাসানীর লংমার্চের দাবিই সঠিক ছিল। এই ফারাক্কার কারণে সব শেষ হয়ে গেল। নদীতে পানি নেই, মাছ নেই। মরুভূমি হয়ে যাচ্ছে গোটা এলাকা।
ফারাক্কা বাঁধের ৫০ বছর পূর্তিতে, বাংলাদেশের নদ-নদী ও পরিবেশে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব গভীর উদ্বেগের বিষয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলায় এ বাঁধটি অবস্থিত। ১৯৬১ সালে এ বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। শেষ হয় ১৯৭৫ সালে। সেই বছর ২১ এপ্রিল থেকে বাঁধ চালু হয়। ফারাক্কা বাঁধ ২ হাজার ২৪০ মিটার (৭ হাজার ৩৫০ ফুট) লম্বা যেটা প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। সেই থেকে এই বাঁধ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য উদ্বেগের বড় কারণ। ফারাক্কা পয়েন্টে ভারত পানি সরিয়ে নেওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে পদ্মায় মারাত্মক পানি সংকট তৈরি হচ্ছে। আবার বর্ষাকালে সেই ফারাক্কারই সব গেট খুলে দেওয়া হচ্ছে, যাতে প্রতিবছরই দেশে বন্যা ও ভাঙনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
ফারাক্কার সরাসরি শিকার রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষ। বিগত ৫০ বছরের মধ্যে এই দুই অঞ্চল দিয়ে বয়ে যাওয়া গঙ্গা নদী উল্লেখযোগ্য হারে সংকুচিত হয়েছে। পানির প্রবাহ কমে আসায় নদীর তলদেশ পলি ও বালিতে ক্রমান্বয়ে ভরাট হতে চলেছে। কয়েক প্রজাতির মাছ ইতোমধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। গঙ্গার ডলফিন ও ঘড়িয়ালের দেখা মিলছে না। পদ্মায় রুপালি ইলিশের ঝাঁক নেই। মহাবিপর্যয়কর অবস্থায় গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার প্রাণবৈচিত্র্য। সরাসরি নদীকেন্দ্রিক পেশা হারানো মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। এদের মধ্যে মৎস্যজীবী, নৌজীবী মানুষের সংখ্যাই অধিক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণের সুন্দরবনে মিঠাপানির সরবরাহ আশঙ্কাজনক হারে কমতে থাকায় সুন্দরী গাছসহ আরও কয়েক প্রজাতির বৃক্ষের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারিতে গঙ্গায় পানি প্রবাহের পরিমাণ ছিল ৯০ হাজার ৭৩০ কিউসেক। ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারিতে পানি প্রবাহের পরিমাণ ছিল ৭৫ হাজার ৪০৯ কিউসেক। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে গঙ্গায় পানি প্রবাহ করেছিল ১৫ হাজার কিউসেক।
ফারাক্কা লং মার্চের ৫০ বছর উদযাপন কমিটির দেওয়া তথ্যমতে, ভারত জাতিসংঘ প্রণীত পানি বিষয়ক কোনো ধরনের সনদ, আইন বা নীতি না মেনে একক ইচ্ছায় কাজ করে চলেছে। এখন অবধি ভারত গঙ্গাসহ শতাধিক অভিন্ন নদীর পানি অন্যায়ভাবে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। এর ফলে ভাটিতে থাকা বাংলাদেশের নানামুখী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের প্রায় ২ কোটি মানুষ সেচের পানির স্বল্পতায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। দেশের মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের বসবাসরত প্রায় ৪ কোটি মানুষ সেচের পানির অপ্রতুলতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত।
অন্যদিকে বিশাল বরেন্দ্র অঞ্চলের গভীর নলকূপগুলোর প্রায় একশত ভাগ অকোজো হয়ে গেছে। আর অগভীর নলকূপের প্রায় ২১ শতাংশ অকার্যকর অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় আর্সেনিকের বিষাক্ত প্রভাবে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক জেলার নলকূপের পানি পানের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। পদ্মার অসংখ্য শাখা-প্রশাখা নাব্যতা হারিয়েছে। বিগত ৪৫ বছরে এ অঞ্চলের প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার নদীপথের নাব্যতা আর নেই।
ফারাক্কা লংমার্চের ৫০ বছর উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট এনামুল হক সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে ৩০ বছরের গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ পূর্ণ হবে। এখনই সময় এই চুক্তির মূল্যায়ন করা। এর জন্য শক্তিশালী বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কমিটি গঠন জরুরি। নতুন চুক্তিতে ১৯৭৭ সালের চুক্তির অনুরূপ গ্যারান্টি ক্লজ অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এ ছাড়া নেপাল থেকে অনেক নদী এসে গঙ্গায় মিশেছে, যার মধ্যে ৫টি নদীর পানি দ্বারা গঙ্গা বিশেষভাবে সমৃদ্ধ। চীনের তিব্বত থেকে দুটি বৃহৎ নদী উৎপন্ন হয়ে নেপালের মধ্য দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে গঙ্গার সঙ্গে মিশেছে। এ জন্য যৌক্তিকভাবে নেপাল এবং চীন গঙ্গার সঙ্গে সম্পৃক্ত। নতুনভাবে গঙ্গা চুক্তির জন্য যে যৌথ কমিশন গঠিত হবে, তাতে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল এবং চীনের সমন্বয়েই হতে হবে। ভারত দ্বিমত পোষণ করলে জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্তিও প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়াবে।
রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান গণমাধ্যমে বলেন, জাতিসংঘ কর্তৃক ১৯৯৭ সালে আন্তর্জাতিক পানি বিষয়ক সনদটি শতভাগ আইনে পরিণত হয়েছে। এই আইন ভাটির দেশের স্বার্থ রক্ষা করছে। বর্তমান সরকারের উচিত জাতির স্বার্থে কালবিলম্ব না করে এই আইনের পক্ষে স্বাক্ষর করা।উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। তথ্য ও ছবি-সংগৃহীত

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!