শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

পানির তলে গেল হাওরের বোরো ধান

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: মে ১৫, ২০২৬, ০৬:৩৫ পিএম

পানির তলে গেল হাওরের বোরো ধান

ডেইলি খবর ডেস্ক: অতিবৃষ্টিতে কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের বিভিন্ন হাওরে এখনো প্রায় ১৫০ হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে আছে। কৃষি বিভাগের দাবি, এই দুই উপজেলায় ৯৫ থেকে ৯৬ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। তবে ভুক্তভোগী কৃষকরা বলছেন, পঁচাসহ সর্বোচ্চ ৮০ ভাগ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। মিঠামইনের চমোকপুরের কৃষক ইসলাম উদ্দিন (সাবেক মেম্বার) জোয়াইরা হাওরে ৮ একর জমি চাষ করেছেন। তার জমি এখনো পানির নিচে। শ্রমিকের অভাবে কাটতে পারেননি। শুক্রবার সকালে চমোকপুরের হাওরের রাস্তায় দেখা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘৮ খানি ক্ষেত করছি, সব ক্ষেত ওই পানির তলে। ক্ষেতের ধারে গাড়ি যায় না, ক্ষেত কাটবার দাওয়ালও পাই না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার সব শেষ। আমি মাইনষেরে কইছি, তোমরা আমার ক্ষেত কাইট্টা আধা লইয়া যাও, এরপরেও কেউ যায় না। ১ খানি ক্ষেত কাটলে ১ জন কামলারে ২৫০০ টেহা দেওন লাগবো। ৬ জন কামলা লইলে ১৫ হাজার টেহা দেওন লাগবো। সারা বছরের খোড়াক, মহাজনের শোধের টেহা কইত্তেন দিমু। দেশ ছাইড়া যাওন ছাড়া কোনো গতি নাই।’ ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকারি সহায়তা প্রসঙ্গে এই কৃষক বলেন, ‘সরকারের লিস্টিতে নাম তুললে কী হইবো, কয় টেহা পাইমু।’ 
শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত চার দিন রোদ থাকলেও দুপুরের পর থেকে ফের বৃষ্টি ও বাতাস শুরু হওয়ায় কৃষকদের মাঝে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। কৃষকরা জানান, হাওরের বিভিন্ন খাল খনন না হওয়ার ফলে এ সকল খাল এখন জমি হয়ে গেছে। অষ্টগ্রামের হাওরের একমাত্র জোয়াইরা খাল ও কাটা খাল বন্ধ হয়ে গেছে। এ দুটি খালের কারণে অধিকাংশ জমি এখনো পানির নিচে।তাদের দাবি, আশেপাশে বেলাবরের আড্ডা, কাজাগড়িয়া ও নদারের হাওরে এখনো শতাধিক একর জমি পানির নিচে রয়েছে। কাটার কোনো ব্যবস্থা নাই।সরেজমিনে জোয়াইরা বিলে গিয়ে পানির তলে জমি তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে। সেখানে কথা হয় কয়েকজন ভুক্তভোগী কৃষকের সঙ্গে।  স্থানীয় একাধিক কৃষক বলেন, ‘১ খানি ক্ষেত করছি, পানির তলে ক্ষেতের ধান অহনো রয়েছে। কাটবার মানুষ পাই না। একজন কামলারে ২,৫০০ টেহা, নাইলে তিন মন ধান দেওন লাগবো ক্ষেত কাটলে। এ ক্ষেত কাটলে কামলার টেহাও হয়তো না। সারাবছর কেমনে চলমু, ঋণ করছিলাম ক্ষেত করবার সময়।’  একই কথা বললেন কৃষক জিরন মিয়া। তিনি জোয়াইরা বিলে ৫ একর জমি করেছেন। তার জমিও এখনো পানির নিচে। বল্লি বিলের কৃষক খলাপাড়া গ্রামের সালাউদ্দিন মিয়া বলেন, ‘৩ একর জমি পানির নিচে। কাটার মতো কোনো ব্যবস্থা নাই। দিন-রাইত খাইয়া না খাইয়া পইড়া রইছি হাওরে, জমি পাহারা দেওনের লাগি, একমুঠ ভাতের লাগি।’
অন্যদিকে অষ্টগ্রামের সীমানায় জোয়াইরা হাওরে ডিআইজির বাতানে এখনো ৫০ একর জমি পানির নিচে। ডিআইজির বাতানে একটি বাঁধ থাকলেও বাঁধের ভিতরেও পানি ঢুকে পড়ছে।নদার হাওরের ২ কৃষক কবির ও মজিদ মিয়া বলেন, ‘২ জনে ৪ একর জমি করছিলাম মহাজনের কাছ থেইক্কা শোধি টেহা আইন্না। একমুঠ ধানও কাটতাম পারছি না, সব পানির তলে। অহন নিজে এই কী খাইমু, কেমনে ঋণ দিমু, হেই চিন্তায় ঘুম হয় না। গরুরও খাওন নাই। ৪টা গরু বেইচ্চা দিমু।’মিঠামইন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওবায়দুল ইসলাম অপু বলেন, মিঠামইনে প্রাথমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত তালিকায় ৩ হাজার ৬৮৮ জনের নাম এসেছে। মোট ক্ষতি হয়েছে ৮৯৬ হেক্টর। তিনি আশা করছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে শতভাগ ধান কাটা শেষ হবে। কোনো কোনো জায়গায় কৃষি শ্রমিকের অভাবে তলিয়ে যাওয়া ধান কৃষকরা কাটতে পারছে না। পানির মধ্যে আধুনিক মেশিন (হারভেস্টার) দিয়েও ধান কাটতে পারে না।অষ্টগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অভিজিৎ পণ্ডিত জানান, প্রাথমিকভাবে ৬ হাজার ৯৯৪ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের নাম তালিকায় আসছে। এ পর্যন্ত ৯৫ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ মোট ৩ হাজার ১৭৪ হেক্টর জমি।জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ডা. সাদিকুর রহমান জানান, জেলার প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ইটনা ও অষ্টগ্রাম। মিঠামইনে ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কম। ছবি-সংগৃহীত

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!