সোমবার, ২২ জুলাই, ২০২৪, ৭ শ্রাবণ ১৪৩১

রাজনীতির আলোচনায় জুবাইদা রহমান

প্রকাশিত: ১২:১৫ পিএম, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৩

রাজনীতির আলোচনায় জুবাইদা রহমান

দীর্ঘ অসুস্থতা এবং আইনি বাধ্যবাধকতায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বর্তমানে রাজনীতির মাঠের বাইরে রয়েছেন। এ কারণে দল পরিচালনায় কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেন না তিনি। ফলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি দল পরিচালনা করছেন। তবে দুজনই একাধিক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। দুই বছরের বেশি দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় আইন অনুযায়ী দুজনই নির্বাচনে অযোগ্য বিবেচিত হবেন বলে মনে করেন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। এমন পরিস্থিতিতে দলে নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণে তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান বিকল্প হতে পারেন বলে অনেকেরই ধারণা। এমন গুঞ্জন রাজনীতিতে বহুদিন ধরেই চলে আসছে। কিন্তু জুবাইদা রহমান এখন পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় নন, অতীতেও ছিলেন না। বিএনপি নেতাদের দাবি, তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল বর্তমানে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বিএনপি এখন অত্যন্ত সুসংগঠিত ও শক্তিশালী। সাম্প্রতিক বিভিন্ন কর্মসূচিতে সেটা প্রমাণিতও হয়েছে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল সর্বত্রই নেতাকর্মীরা তারেক রহমানের নেতৃত্বেই ঐক্যবদ্ধ। জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, রাজনীতিতে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা-সমালোচনা থাকতেই পারে। তবে সেটা আমাদের ধর্তব্যের মধ্যে নেই। তারেক রহমান আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তার নেতৃত্বে দল পরিচালিত হচ্ছে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তার নেতৃত্বে আন্দোলন চলমান রয়েছে। আমরা আশাবাদী, জনসম্পৃক্ত চলমান আন্দোলনে বর্তমান সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। জুবাইদা রহমানের জন্ম সিলেটে। তার বাবা রিয়ার অ্যাডমিরাল প্রয়াত মাহবুব আলী খান সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধান ছিলেন। আর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকারে তিনি যোগাযোগ ও কৃষি উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৫ সালে বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেন জুবাইদা রহমান। পরে প্রেষণে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে এমডি কার্ডিওলজি বিভাগে ভর্তি হন তিনি। প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষ কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে তৃতীয় বর্ষে ভর্তি হন। এরপর সেনা সমর্থিত ওয়ান-ইলেভেন সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এলে ডা. জুবাইদাকে টাঙ্গাইলের নাগরপুরে বদলি করা হয়েছিল। ওই ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় ২০০৭ সালে গ্রেপ্তার হন তারেক রহমান। ২০০৮ সালে জামিনে কারামুক্তির পর শিক্ষাছুটি নিয়ে তারেক রহমানের চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান ডা. জুবাইদা। স্বামী তারেক রহমান ও একমাত্র মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে নিয়ে বর্তমানে সেখানেই অবস্থান করছেন। লন্ডনে থাকা অবস্থায় যুক্তরাজ্যের ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন থেকে কার্ডিওলজিতে তিনি এমএসসি সম্পন্ন করেন বলে জানা যায়। তবে দেশে কর্মস্থলে ৫ বছরের বেশি অনুপস্থিত থাকায় ২০১৪ সালে সরকারি চাকরি হারান ডা. জুবাইদা। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মোট ৩৭টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে দুটিতে সাজা হয়েছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় ১০ বছর এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় ৭ বছর সাজাপ্রাপ্ত হন তিনি। অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যান খালেদা জিয়া। পরে পরিবারের আবেদনে সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ সাময়িক কারামুক্ত হওয়ার পর থেকে গুলশানের ভাড়াবাসা ফিরোজায় রয়েছেন তিনি। অন্যদিকে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আদালতে দুই ডজনের বেশি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে মুদ্রা পাচারের মামলায় ২০১৩ সালে প্রথম রায়টি হয় এবং তাতে খালাস পেয়েছিলেন তারেক রহমান। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিলের পর হাইকোর্টের রায়ে ৭ বছরের দণ্ডাদেশ হয়। এর পাঁচ বছর পর ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারিতে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় মায়ের সঙ্গে তারেকেরও কারাদণ্ডের রায় হয়। তারেক রহমানের ১০ বছর সাজা হয়। এরপর ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায় ২০১৮ সালের অক্টোবরে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। তবে বিএনপির দাবি, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ১২ ধারা অনুযায়ী, দুই বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি সংসদ নির্বাচনে অযোগ্য হবেন। সেইসঙ্গে সাজা ভোগ শেষে পাঁচ বছর পার করার পরই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। বিএনপির দুই শীর্ষ নেতা সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণে তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান দলের হাল ধরবেন—রাজনীতিতে এমন কথা বহুদিন ধরেই শোনা যাচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জুবাইদা রহমান বুদ্ধিবৃত্তিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেকে জড়িত রেখেছেন। জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের (জেডআরএফ) অরাজনৈতিক কর্মসূচিগুলোতে বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে কোনো প্রতিযোগিতামূলক প্রোগ্রাম হলে সেখানে তিনি ভার্চুয়ালি যুক্ত হন। এর বাইরে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার কোনো অংশগ্রহণ নেই। গত ৩ ফেব্রুয়ারি জেডআরএফ আয়োজিত ভার্চুয়াল বিজ্ঞান মেলায় বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশ নিয়ে বক্তব্য দেন ডা. জুবাইদা, যিনি সংগঠনটির ওভারসিজ কমিটির প্রধান উপদেষ্টা। একই অনুষ্ঠানে তারেক রহমান তার বক্তৃতায় ডা. জুবাইদার ভূয়সী প্রশংসা করেন। এদিকে ডা. জুবাইদা রহমান ভবিষ্যতে বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হতে পারেন—এমন খবরে ২০১৬ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জুবাইদার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘সে (জুবাইদা) শিক্ষিতা এবং ভালো বংশের মেয়ে। সে রাজনীতিতে এলে ভালোই হবে।’ অবশ্য রাজনীতিতে সম্পৃক্ত না হলেও ডা. জুবাইদাকে ইতোমধ্যেই দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় পড়তে হয়েছে। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০০৭ সালে কাফরুল থানায় তারেক রহমান, জুবাইদা রহমান ও তারেকের শাশুড়ি সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানুর বিরুদ্ধে এই মামলা করে দুদক। আগামী ২৯ মার্চ এই মামলায় তারেক রহমান ও জুবাইদার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি হবে। তবে বিএনপি বলছে, শুধু জিয়া পরিবারের পুত্রবধূ হওয়ায় ডা. জুবাইদা সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। বিএনপির রাজনীতিতে ডা. জুবাইদার সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারী বলেন, ডা. জুবাইদা রহমান বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন কিনা, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। তবে জুবাইদা রহমানকে যদি এ মুহূর্তে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে সেটা সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত হবে। অবশ্য জুবাইদা রহমানের অভিজ্ঞতা নিয়ে হয়তো অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন। তবে মনে রাখতে হবে, জুবাইদা রহমানের রক্তে রাজনীতি প্রবাহিত। তার দাদা খুব সম্ভবত অবিভক্ত আসামের ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লির সদস্য ছিলেন। ওই বাড়িতে অবিভক্ত ভারতের পাঁচজন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস ছিলেন। একদিকে আমলাতান্ত্রিক ব্লাড, অন্যদিকে রাজনৈতিক ব্লাড। আর বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাজনীতিবিদদের মধ্যে যে গুণটা সবচেয়ে বেশি থাকা দরকার, সেই সততার দিকটিও তার মধ্যে রয়েছে। যদিও তার বিরুদ্ধে একটা মামলা হয়েছে—সেটা রাজনৈতিক মামলা। তিনি আরও বলেন, শিক্ষাগত যোগ্যতা, মেধা, ইনোভেটিং (উদ্ভাবনী) কথাবার্তায় অনন্য ডা. জুবাইদা। বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় গ্রেপ্তার হয়ে যখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন, তখন তার (জুবাইদা) একটি কথায় সেটা প্রমাণিতও হয়। নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তখন তিনি (জুবাইদা) বলেছিলেন—আপনারা এখানে ভিড় করবেন না, আপনারা চলে যান। কী করতে হবে—সে ব্যাপারে তিনি (তারেক রহমান) পরে সিদ্ধান্ত নেবেন। অর্থাৎ সঠিক সময়ে সঠিক কথাটা বলার যে বিচক্ষণতা, সেটাও আমি তখন তার মধ্যে দেখেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক এই অধ্যাপক বলেন, ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) সঙ্গে আলোচনা করে তারেক রহমান যদি এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সেটা হবে বেস্ট ডিসিশন। কিন্তু সেটা পারেন কিনা, সেটা হলো প্রশ্ন। যদি এই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা জোয়ারের সৃষ্টি হবে। যেই মামলা দিয়ে তাকে আটকানোর চেষ্টা হচ্ছে, দেশে এসে যদি তিনি (জুবাইদা) অ্যারেস্টও হন, বিএনপির নেতাকর্মী বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে তৃণমূলে একটা নবজাগরণ সৃষ্টি হবে। তখন ওপরের সারির নেতারাও তার বিরোধিতা করার সাহস পাবেন না।
Link copied!