বৃহস্পতিবার, ২০ জুন, ২০২৪, ৬ আষাঢ় ১৪৩১

আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া পিকের সহযোগী শুভ্রা গ্রেপ্তার

প্রকাশিত: ০৩:৫১ এএম, মার্চ ২৩, ২০২১

আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া পিকের সহযোগী শুভ্রা গ্রেপ্তার

সুব্রত দাস ও শুভ্রা রানী ঘোষের বাড়ি যশোর জেলার মনিরামপুর উপজেলার মোবারকপুর গ্রামে। সাধারণ কৃষক দুলাল হরি দাসের ছেলে সুব্রত ঢাকায় এসে গার্মেন্টস এক্সেসরিজের ব্যবসা করতেন। সেই ব্যবসার জন্য কিছু ঋণ নিতে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে যান। সেখানে পরিচয় হয় প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের সঙ্গে। কাছাকাছি বয়স ও কয়েকবার যাতায়াতের সুবাদে হয় ঘনিষ্ঠতা। সুব্রতের সূত্রে পি কের সঙ্গে পরিচয় হয় তার স্ত্রী শুভ্রা ঘোষের। কোনো ধরনের জামানত ছাড়া শুধু কাগুজে প্রতিষ্ঠান তৈরি করে সুব্রত-শুভ্রা দম্পতিকে দেওয়া হয় ৮৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। যার পুরোটাই আত্মসাৎ ও পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই ঋণ নেওয়ার জন্য শুভ্রা ও সুব্রতের যে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্যবহার করা হয় সেটাও ছিল ভুয়া। এ ঘটনায় দুদক তাদের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছে। দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তারা বলছেন, ওকায়ামা লিমিটেড নামে অস্তিত্বহীন কাগুজে কোম্পানির নাম ব্যবহার করে সুব্রত ও শুভ্রা দম্পতি প্রায় ৮৮ কোটি টাকা বের করে নিয়েছেন। এ ঘটনায় করা মামলায় সুব্রত-শুভ্রার সঙ্গে প্রধান আসামি পি কে। শুভ্রা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসার সময় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুদকের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তার স্বামী একই মামলার অন্যতম আসামি সুব্রত এখনো যুক্তরাষ্ট্রে আত্মগোপনে আছেন। সুব্রতের গ্রামের বাড়ি মনিরামপুরের রাজগঞ্জ বাজারের পাশে মোবারকপুর গ্রামে। ওই গ্রামের সাধারণ কৃষক দুলাল হরি দাসের ছেলে তিনি। মোবারকপুরের যুবলীগ নেতা ইমরান খান পান্না বলেন, ‘আমরা তাদের সাধারণ নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ হিসেবেই চিনি-জানি। কিন্তু গত পাঁচ-ছয় বছরে তাদের উন্নতি হয়েছে আকাশচুম্বী। এলাকায় মূল সড়কের ব্রিজের পাশে দৃষ্টিনন্দন আলিশান বাড়ি করেছেন। কিনেছেন জমি। বিভিন্ন প্রজেক্ট করার চেষ্টা করেন এলাকায়। পূজাপার্বণে এলাকায় গিয়ে দুহাতে টাকা ওড়ান সুব্রত। প্রায়ই দামি দামি গাড়ি নিয়ে বেশ কয়েকজন বন্ধুবান্ধব এলাকায় আসেন তার সঙ্গে। এলাকার মানুষ জানে তিনি (সুব্রত) ঢাকায় গার্মেন্টসের বড় ব্যবসায়ী। কিন্তু কোথায় কোন গার্মেন্টসের মালিক তিনি সেটা এলাকার কেউ জানে না। এমনকি এলাকার কাউকে তাদের কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজও দেননি। ’ সুব্রত দাসের প্রতিবেশী উত্তম চক্রবর্তী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুধু এলাকাতেই নয়; ঢাকার উত্তরায় আলিশান ফ্ল্যাট ও একটি হাউজিং প্রকল্পে জমি কিনেছেন সুব্রত। সেই জমি ও ফ্ল্যাট কেনার আয়ের উৎস কী সেটা এলাকার কেউ জানেন না।' দুদক থেকে পাওয়া নথি বলছে, সুব্রতের ঢাকার ঠিকানা বাড়ি নম্বর-৭, রোড নম্বর-১, সেক্টর-১৩ উত্তরা পশ্চিম। তিনি ওকায়ামা লিমিটেড নামক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। তার স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক। একই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে নাম লেখা রয়েছে কুমিল্লার চান্দিনা থানার ইলিয়টগঞ্জ এলাকার বিলপুর গ্রামের মোবারক হোসেনের ছেলে তোফাজ্জল হোসেনের নাম। তার বর্তমান ঠিকানা দেখানো হয়েছে সেন্ট্রাল ক্রাউন, ৭/এইচ, পশ্চিম হাজীপাড়া, খিলগাঁও, রামপুরা ও বাসা নং ১৫১/২/৩৭-এর তারাবাগ, থানা খিলগাঁও। পি কে হালদারের অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ তদন্ত দলের প্রধান দুদকের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান বলেন, ‘সুব্রত দাস ও শুভ্রা দাসের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে আগেই। তাদের কথিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ওকায়ামার চেয়ারম্যান, সুব্রত দাস (৫৩), পরিচালক তার স্ত্রী শুভ্রা রানী ঘোষ (৪৬) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক তোফাজ্জল হোসেনের (৫০) স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিস দেওয়া হয়েছে। সুব্রত ও শুভ্রা দম্পতি জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা অর্থ দিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে। সুব্রত এখনো সেখানেই অবস্থান করছেন। ’ দুদকের তদন্ত দলের এক সদস্য জানান, পি কে হালদারের সহযোগিতায় ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদুল হক, ভারপ্রাপ্ত এমডি মো. আবেদ হোসেন, প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান এমএ হাশেম এবং বোর্ড সদস্যরা অসৎ উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার করে যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ অনুমোদন করেন। তারা এসব ঋণের বিপরীতে কোনো ধরনের জামানত নেননি। তারা অস্তিত্বহীন পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে ৪৯৪ কোটি ৬ লাখ টাকা ভুয়া ঋণ অনুমোন করেন। ঋণগ্রহীতারা এসব টাকা তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করেন। তিনি আরও জানান, মেসার্স লিপরো ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের নামে ১৭৪ কোটি টাকা, আরবি এন্টারপ্রাইজের নামে ৫৫ কোটি টাকা, ওকায়ামা লিমিটেডের নামে ৮৭ দশমিক ৬০ লাখ টাকা, ইমেক্সোর নামে ৫৮ কোটি টাকা, কনিকা এন্টারপ্রাইজের নামে ৬০ কোটি টাকা ও আর্থস্কোপ লিমিটেডের নামে ৬০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। এ সবকটি প্রতিষ্ঠানই ভুয়া ও নামসর্বস্ব এবং সব প্রতিষ্ঠানের মাত্র দুই ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। পি কে হালদারের বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল দুদক সচিব ড. মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, পি কে হালদারকে গ্রেপ্তারের জন্য আন্তর্জাতিক পুলিশি সংস্থা ইন্টারপোলের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। তারা পি কে হালদারকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে। আশা করছি তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে। দেশে ফিরেই দুদকের কাছে ধরা খেলেন পি কের সহযোগী শুভ্রা পলাতক প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারে সহযোগিতার অভিযোগে শুভ্রা রানী ঘোষকে (৪৬) গ্রেপ্তার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল সোমবার দুপুরে কাতার এয়ার ওয়েজের একটি ফ্লাইটে যুক্তরাষ্ট্র থেকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর তাকে গ্রেপ্তার করে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ড চাইলে আদালত তা মঞ্জুর করে বলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান আনোয়ার প্রধান দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার শুভ্রা, তার স্বামী সুব্রত দাস, পি কে হালদারসহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস লিমিডেট থেকে ওকায়ামা লিমিটেড নামক প্রতিষ্ঠানের নামে ৮৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে মামলা করে দুদক। শুভ্রা ও সুব্রতর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে দুদক। দুদকের তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে দেশে ফিরছিলেন শুভ্রা। দুদকের কাছে গোয়েন্দা সূত্রে আগেই সেই তথ্য ছিল। তাকে গ্রেপ্তার করতে সোমবার সকাল থেকেই প্রস্তুত ছিল দুদকের টিম। দুপুর ১২টায় দুদকের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধানের নেতৃত্বে একটি টিম তাকে আটক করার পর বিমানবন্দর থেকে ২টা ৪৫ মিনিটে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে আসে। সেখান থেকে তাকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। পি কের অর্থ আত্মসাৎ ও পাচার কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে এখন পর্যন্ত দুদক ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। ১৬ মার্চ নাহিদা রুনাই, সৈয়দ আবেদ হাসান ও রাফসান রিয়াদ চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে উজ্জ্বল কুমার নন্দী, শংখ বেপারী, রাশেদুল হক এবং সর্বশেষ অবন্তিকা বড়াল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। রুনাইয়ের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত।
Link copied!