রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১

৭ মাসে যুবলীগ-ছাত্রলীগের ৩ নেতা খুন, ফের আতঙ্কে লক্ষ্মীপুরবাসীc

প্রকাশিত: ১২:৪৮ পিএম, মে ১, ২০২৩

৭ মাসে যুবলীগ-ছাত্রলীগের ৩ নেতা খুন, ফের আতঙ্কে লক্ষ্মীপুরবাসীc

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর হস্তক্ষেপে এক সময়ের আতঙ্কের জনপদ লক্ষ্মীপুর শান্ত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু হঠাৎ করে আবারও অশান্ত হয়ে পড়েছে এ জনপদ। একের পর এক হত্যা পুরো জেলায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। প্রায় ৭ মাস আগে বশিকপুরের যুবলীগ নেতা আলাউদ্দিনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেই খুনের রেশ কাটতে না কাটতেই একই এলাকায় জেলা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রাকিব ইমামকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ‘খুনোখুনির’ এলাকা হিসেবে পরিচিত বশিকপুরেই গত দুই যুগে হত্যা করা হয়েছে ২৪ নেতাকর্মীকে। দলীয় নেতাদের মরদেহ তৃণমূল আওয়ামী লীগে অসন্তোষ ও ভীতি সৃষ্টি করছে। শনিবার (২৯ এপ্রিল) বিকেলে জেলা যুবলীগ পরিবারের ব্যানারে নোমান-রাকিব হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করা হয়েছে। এতে হত্যার সঙ্গে জড়িত মূলহোতাকে ক্রসফায়ারসহ আসামিদের সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানিয়েছেন বক্তারা। এদিকে হত্যা মামলার চার আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ও র‍্যাব-১১। তাদের ৪ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। কিন্তু আটক হননি প্রধান আসামি চন্দ্রগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবুল কাশেম জিহাদি, দ্বিতীয় আসামি মশিউর রহমান নিশান ও রামগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক দেওয়ান ফয়সালসহ এজাহারভুক্ত ১৫ জন। তাদের অবস্থানও নিশ্চিত নয়। ঘটনার পর থেকেই কাশেম আত্মগোপনে রয়েছেন। এখনো তিনি ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। তার মোবাইল ফোনও বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে কাশেম জিহাদি প্রধান আসামি হলেও জেলা আওয়ামী লীগ থেকে এখনো তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পুলিশের তদন্তে যদি তিনি দোষী প্রমাণিত হলে তবেই দলীয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম ফারুক পিংকু। এমনকি নিহত নোমান জেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক হলেও কোন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়নি। আওয়ামী লীগ সভাপতি পিংকু বলেন, কাশেম জিহাদি আমাদের দলের নেতা। তাকে নোমান-রাকিব হত্যায় আসামি করা হয়েছে। আসামি যে কেউই হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রকৃত আসামিদের শনাক্ত করতে কাজ করছে। যদি কাশেম প্রকৃত দোষী হয় তাহলে দলীয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর নোমান-রাকিব হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে আমরা মানববন্ধনের আয়োজন করব। শিগগিরই এ কর্মসূচি পালন করা হবে। মামলার দ্বিতীয় আসামি করা হয়েছে বশিকপুর ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মশিউর রহমান নিশানকে। তিনি জিহাদী বাহিনীর অন্যতম সদস্য। তবে সদর (পশ্চিম) উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক মাহবুবুল হক মাহবুব ও সদর (পূর্ব) উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক আমির হোসেন আমু বশিকপুরকে নিজেদের এলাকা বলে স্বীকার করছেন না। যুবলীগ নেতা আমির হোসেন বলেন, বশিকপুর আমার এলাকা নয়। এটি লক্ষ্মীপুর-২ আসনে পড়েছে, সেই সূত্রে এ ইউনিয়ন সদর পশ্চিমের আওতায়। যুবলীগ নেতা মাহবুব বলেন, চন্দ্রগঞ্জ থানা হওয়ার পর থেকে বশিকপুর নিয়ে আমাদের তৎপরতা নেই। ওই ইউনিয়নে নতুন কোন কমিটিও গঠন করিনি আমরা। আর নিশানকে আসামি করা হয়েছে তাও আমাদের জানা নেই। এছাড়া নোমান-রাকিব হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় একটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে অস্ত্র হাতে আটজন যুবককে হাঁটতে দেখা যায়। সেখানে রামগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম-আহবায়ক দেওয়ান ফয়সালকে দেখা গেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। তাকে মামলার ৩ নম্বর আসামি করা হয়। কিন্তু ফয়সাল ঘটনার দিন রাত সাড়ে ১০ টা পর্যন্ত সদর উপজেলা উত্তর হামছাদী ইউনিয়নের ছৈয়ালখালী গ্রামে ফয়সাল ভূঁইয়ার গায়ে হলুদে ছিলেন বলে নিশ্চিত করেছেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি বেলায়েত হোসেন। এজন্য তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি। একই কথা বলেছেন দেওয়ান ফয়সালের বড়ভাই রামগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন দেওয়ান বাচ্চু। তিনি বলেন, ’আমার ভাই উত্তর হামছাদীতে একটি গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে জেলা নেতাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। ইতোমধ্যে ওই অনুষ্ঠানের ছবি ও ভিডিও ফেসবুকেও ছড়িয়ে পড়েছে। হত্যা মামলায় আমার ভাইকে আসামি করার ঘটনাটি ষড়যন্ত্র হতে পারে। এরপরও যদি পুলিশের তদন্তে আমার ভাই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিল বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে তাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। এনিয়ে আমার অন্য কোন মন্তব্য নেই। ফয়সাল কোথায় আছে তা জানাতে পারেননি তিনি’। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বশিকপুর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে নোমানের ভাই মাহফুজুর রহমানের সঙ্গে চেয়ারম্যান পদে ভোটে হেরে যান কাশেম জিহাদি। এরপর থেকেই জিহাদি বিভিন্নভাবে ও সরাসরি একাধিকবার নোমানকে হত্যার হুমকি দিয়েছে। নির্বাচনের সময় রাকিবও নোমানদের পক্ষে কাজ করেছেন। সেখান থেকেই কাশেম জিহাদির টার্গেটে ছিলেন নোমান ও রাকিব। গত ২০ ডিসেম্বর পোদ্দার বাজার কায়কোবাদ অডিটোরিয়ামে এক অনুষ্ঠানে রাকিবকে মারধরের পর প্রকাশ্যেই হত্যার হুমকি দেয় জিহাদি। সেই টার্গেট থেকেই তাদেরকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া জিহাদির সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে পরিচিত হলেও বশিকপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সহ-সভাপতি আলাউদ্দিন হত্যার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা। যদিও ওই মামলায় তাকে আসামি করা হয়নি। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাশেম প্রথমে ছিলেন ডাকাত। এরপর হয়েছেন জামায়াতের কর্মী। রকেট ল্যাঞ্চার চালানোসহ নানা কারণে তার নামের পাশে জিহাদি জুড়ে দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, নামের পাশে ‘জিহাদি’ যুক্ত করেছে জামায়াতে ইসলামি। ১৯৯৮ সালে তিনি জামায়াত থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। এরপর দু’বার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পরবর্তী ১০ বছরের মধ্যে নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে চারটি হত্যাসহ ২৩টি মামলার আসামি হন তিনি। তবে বর্তমানে তার বিরুদ্ধে দুটি হত্যা এবং একটি চাঁদাবাজি মামলা রয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার মাহফুজ্জামান আশরাফ। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বশিকপুর হচ্ছে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বর্ডার এলাকায়। এ ইউনিয়নটি রামগঞ্জ উপজেলা ও নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলা সংলগ্ন। এতে বশিকপুর অপরাধীদের আঁতুড়ঘর পরিচিত। বশিকপুর হচ্ছে লক্ষ্মীপুর-২ সংসদীয় আসনের একটি ইউনিয়ন। উপজেলা সদর হলেও এ ইউনিয়ন চন্দ্রগঞ্জ থানার অধীন। ২০১৭ সালে সন্ত্রাসী বাহিনী প্রধান লাদেন মাসুম গোলাগুলিতে নিহত হওয়ার পর থেকেই কাশেমের আধিপত্য বেড়ে যায়। ধীরে ধীরে বেপরোয়া হয়ে উঠেন তিনি। লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার মাহফুজ্জামান আশরাফ সাংবাদিকদের বলেন, চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের আমরা আইনের আওতায় আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। প্রধান আসামিকে জিহাদিকে গ্রেপ্তারের সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে চারজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদেরকে আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। কারা, কেন এ হত্যা করেছে আশা করি তা বের হয়ে আসবে। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের তিনজন নেতা জানায়, ‘সন্ত্রাসীর কোনো দল নেই। কাশেম নিজ নামে বাহিনী গঠন করে ২ যুগের বেশি সময় ধরে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছে। দল যখন ক্ষমতায় ছিল না, তখনও তিনি বহাল তবিয়তে ছিলেন। তার কারণে ওই এলাকার মানুষ শঙ্কিত-আতঙ্কিত। কেউ তার বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ করতে পারে না। প্রতিবাদী হলেই নেমে আসে হামলা, নির্যাতন ও খুনখারাবি। কার বলয়ে তিনি এতো ক্ষমতাধর তা রহস্যজনক’। বশিকপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আমির হোসেন জানান, ‘১৯৯৮ সালের শুরু হওয়া সন্ত্রাস এখনো চলছে। ২৪ জনের জীবন গেছে। অনেকেই পঙ্গু হয়েছেন। কারা সন্ত্রাস করছেন, কে বাহিনী পরিচালনা করছেন, কারা তাদের গডফাদার সবাই তা জানে। তারা এ সন্ত্রাস ও আতঙ্ক থেকে মুক্তি চান। স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে চান।’ বশিকপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচনে হারার পর থেকেই আমার ভাই নোমান সন্ত্রাসী জিহাদির টার্গেটে ছিল। নোমানকে গুলি করে হত্যার করবে বলে জিহাদি সরাসরি আমাকে হুমকি দিয়েছে। জিহাদির সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজি কর্মকাণ্ডে আমার ভাই প্রতিবাদ করতো। এতে জিহাদী তার বাহিনীকে নিয়ে আমার ভাই নোমান ও রাকিবকে গুলি করে হত্যা করেছে। জিহাদিকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। কিন্তু এখনো তাকে ধরতে পারেনি প্রশাসন। কিন্তু কেন, তা প্রশাসনই জানে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের মদদে যুগ যুগ ধরে বশিকপুরে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ লাগামহীন। ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১৯৯৮ সালে প্রকাশ্যে দফাদার আবুল বাশারের পায়ে প্রথম গুলি করেন আওয়ামী লীগ নেতা জিহাদি। সেই থেকে হত্যাকাণ্ড শুরু। একই বছর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি হাবিবুর রহমান বাবুলকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর থেকেই চলছে ধারাবাহিক সন্ত্রাস-নৈরাজ্য। একে একে হত্যা করা হয় ২৪ নেতাকর্মীকে। এরমধ্যে গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে বশিকপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সহ-সভাপতি আলাউদ্দিন পাটওয়ারীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২০২১ সালের ৪ আগস্ট হত্যা করা হয় ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদকে। ২০১৩ সালের ২২ নভেম্বর ঘুমন্ত অবস্থায় মোরশেদ আলমকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ২০১৫ সালের ১৭ জুন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা মফিজ উল্যাকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। একই বছরের ২১ মার্চ গাছে বেঁধে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় চাটখিলের আওয়ামী লীগ নেতা ব্যবসায়ী গোলাম মাওলাকে। ২০১৬ সালের ২৫ মে প্রকাশ্যে স্থানীয় বিএনপি নেতা সহোদর ইসমাইল হোসেন হোসেন চৌধুরী ও ইব্রাহিম হোসেন রতনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই বছরের ৫ আগস্ট হত্যা করা হয় ৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি মো. ফয়সালকে। প্রসঙ্গত, ২৫ এপ্রিল রাতে সদর উপজেলার বশিকপুর ইউনিয়নের নাগেরহাট সড়কে সন্ত্রাসীরা যুবলীগ নেতা নোমান ও ছাত্রলীগ নেতা রাকিবকে গুলি করে হত্যা করে। এ সময় তাদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ও মোবাইল নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। ঘটনার ২৭ ঘণ্টা পর ২৬ এপ্রিল রাত ১টার দিকে কাশেম জিহাদিসহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন নোমানের বড় ভাই মাহফুজুর রহমান। মামলার পর গ্রেপ্তারকৃত আসামি ইসমাইল হোসেন পাটোয়ারী, মো. সবুজ, মনির হোসেন রুবেল ও আজিজুল ইসলাম বাবলুকে ৪ দিনের রিমান্ড দেন আদালত।
Link copied!