বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ৯ ফাল্গুন ১৪৩০

রাজনীতির আড়ালে চাঁদাবাজি

প্রকাশিত: ০১:৪৮ পিএম, মে ২৪, ২০২২

রাজনীতির আড়ালে চাঁদাবাজি

ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ মানুষ-ব্যবসায়ী-বাড়িওয়ালাদের কাছে ‘সাঈদী গ্রুপ’ একটি মহা আতঙ্কের নাম। এই গ্যাংয়ের সদস্যরা ছাত্রলীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর অনুসারী। আর সাঈদী হলেন প্রভাবশালী ছাত্রলীগ নেতা জোবায়ের আহমেদের খুব কাছের একজন। যে কারণে সাঈদীকে র‌্যাব গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার সময় ছিনিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন জোবায়ের। পরে নিজেও গ্রেফতার হওয়ার পর আদালত ঘুরে বর্তমানে জামিনে আছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব তথ্য জানিয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর পরিবার-স্বজনরা বিএনপি রাজনীতিতে সক্রিয়। এ সংক্রান্ত একাধিক প্রমাণ সময়ের আলোর হাতে এসেছে। গোয়েন্দারা জানতে পেরেছে, সাঈদী ক্ষমতাশীল দল আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের মুখোশ পড়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহসভাপতি পদে থেকেই ‘সাঈদী গ্রুপ’ নাম দিয়ে নিয়মিত চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপকর্ম করে আসছিল। সে মূলত বিএনপি ঘরোনার। সাঈদী ছাত্রলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক জোবায়ের আহমেদের অনুসারী। এই জোবায়েরই সাঈদীকে আপাদমস্তক বিএনপি ঘরনার পরিবার থেকে এনে ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে দেয়। তবে তা শর্ত ছিল- কোনো কারণে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলে, একে অন্যকে গোপনে শেল্টার দেবে। শুধু তাই নয়, গত ১৯ মে জোবায়ের যাদেরকে সঙ্গে নিয়ে সাঈদীকে ছিনিয়ে আনতে র‌্যাবের সঙ্গে ঝামেলায় জড়ায়, তাদের ৬০ শতাংশই ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগের কেউ নয়। তারা মূলত অন্য একটি রাজনৈতিক দলের। যে ঘটনায় র‌্যাব-৩-এর দুই সদস্য আহত হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে ছাত্রলীগ নেতার চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে গত শুক্রবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘আমার নামে চাঁদাবাজি করবে কেন? আমার নামে যে বা যারা চাঁদাবাজি করবে তাদের ছাড় দেওয়া হবে না, অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। গোয়েন্দারা তথ্য-প্রমাণ পেয়েছেন, সাঈদী তার চাঁদাবাজির একটি অংশ জোবায়েরের হাতে দিয়ে বাকি টাকা বিএনপির রাজনীতি করা স্বজনদের মাধ্যমে মির্জা আব্বাসের ক্যাডারদের মামলা লড়াইয়ের জন্য পাঠিয়ে দিত। এবারের ঈদেও ৬৮ লাখ টাকা চাঁদা তুলেছিল সাঈদী। তার বিরুদ্ধে ৫টি মামলার নথি সময়ের আলোর হাতে এসেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজির ঘটনায় সাঈদী ও জোবায়েরকে গ্রেফতারের পর গত ১৯ মে তাদের বিরুদ্ধে বাদী হয়ে মামলা করে র‌্যাব। মামলায় দলবল নিয়ে র‌্যাবের সরকারি কাজে বাধা, দাঙ্গা সৃষ্টি, র‌্যাবের ওপর হামলা-মারধর ইত্যাদির অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাটিতে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জোবায়ের আহমেদকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। দুই নম্বর আসামি করা হয়েছে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে। আর অন্য আসামিরা হলো- মো. কাউছার, সাইফুল ইসলাম রিফাত, মো. সাগর, মো. মাহমুদসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১২৫-১৫০ জন। এর আগে গত বছরের ২১ এপ্রিল রাজধানীর খিলগাঁও থানায় সাঈদী ও তার গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা, মারধর ও লুটের অভিযোগ এনে মামলা করেন শাকিল আহম্মেদ নামে এক ভুক্তভোগী। ওই মামলায় সাঈদীর সহযোগী কাউছার ওরফে ছোট কাউছার, মুসলেম ওরফে বুলেট মুসলেম, রাজু, শাহাবুদ্দিন এবং আবির মণ্ডলের নাম রয়েছে। তার আগে গত বছরের ২৫ জানুয়ারি রাজধানীর সবুজবাগ থানায় সাইফুল ইসলাম নামে একজন ভুক্তভোগী সাঈদী ও তার গ্রুপের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার প্রধান আসামি হলো- দেলোয়ার হোসেন সাঈদী। অন্য আসামিরা হলো- কাওসার ওরফে ছোট কাওসার, হোসেন বাদশা, আশিক, রিমন, সেলিমসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৭-৮ জন। ২০১৯ সালের ২৬ জুন সাঈদীকে প্রধান আসামি করে রাজধানীর খিলগাঁও থানায় মারধর ও লুটের অভিযোগে মামলা করেন ফারজানা আক্তার ওরফে শিল্পী নামে এক নারী। অন্য আসামিরা হলো- কাওসার ওরফে ছোট কাওসার, আশিক, আফনান, সাজ্জাদসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৫-৬ জন। একই বছরের ২০ জানুয়ারি খিলগাঁও থানায় মামলা করেন আরেক ভুক্তভোগী শেখ আলম। সাঈদীকে প্রধান আসামি করা হয়। একই মামলার অন্য আসামিরা হলো- কাওসার ওরফে ছোট কাওসার, রাকিব, মুন্না, শাকিল, নয়ন, হৃদয়, রাসেল এবং ফাহাদ। সূত্র জানিয়েছে, সাঈদীর আপন চাচাতো ভাই ইকবাল হোসেন সবুজবাগ থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, বর্তমানে তিনি ৪নং ওয়ার্ড জাতীয়তাবাদী বিএনপির সদস্য সচিব। সাঈদীর চাচা আক্তার হোসেন সবুজবাগ থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। আরেক চাচা মুক্তার হোসেন যুবদল নেতা। তার এক চাচা গোলাম হোসেন বিএনপি মনোনীত সাবেক ৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর এবং বর্তমান সবুজবাগ থানা বিএনপির সভাপতি। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই রাজধানীর বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। এ ছাড়াও সাঈদীর ফুফাত বোন সেলিনা আক্তার মহানগর যুব মহিলা দলের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ৪নং ওয়ার্ড সবুজবাগ থানা যুব মহিলা দলের সভাপতি। র‌্যাবের দায়ের করা মামলায় গত রোববার সাঈদীর দুদিনের রিমান্ড শেষ হয়েছে। মামলা তদন্তের অংশ হিসেবে এই দুদিনের রিমান্ড যথেষ্ট কি না নাকি আরও রিমান্ডে চাওয়া হবে এ বিষয়ে কোনো কিছুই বলতে চাচ্ছেন না তদন্ত সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা। তবে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রবীন্দ্রনাথ সরকার বলেন, ‘তার আরও রিমান্ড চাওয়া লাগবে কি না আমি এখনই কিছু বলতে পারছি না। আমি বাইরে আছি। অফিসে ফিরে স্যারদের সঙ্গে কথা বলে জানাতে পারব।’
Link copied!