বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০

বিমানবন্দর ও ৩০০ ফুট সড়ক ‘গামছা পার্টির’ নিরাপদ স্থান

প্রকাশিত: ০৯:৩৪ এএম, মে ১৯, ২০২১

বিমানবন্দর ও ৩০০ ফুট সড়ক ‘গামছা পার্টির’ নিরাপদ স্থান

করোনাকালে রাজধানীর বিমানবন্দর ও পূর্বাচলের ৩০০ ফুট সড়ক এলাকাকে ছিনতাইকারী চক্র ‘গামছা পার্টি’ তাদের নিরাপদ স্থান হিসেবে ধরে নিয়েছিল। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর তারা মিলিত হতো টঙ্গী এলাকায়। পরে দলে দলে বিভক্ত হয়ে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়ত ছিনতাইয়ের জন্য। বিশেষ করে উত্তরার আব্দুল্লাহপুর এলাকা থেকে টার্গেট করে যাত্রী তুলত তারা। খিলক্ষেত ফ্লাইওভার ও ৩০০ ফুট এলাকায় পৌঁছে যাত্রীর সর্বস্ব কেড়ে নিত। কেউ আপত্তি করলেই তাকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হতো। লাশ ফেলে দেওয়া হতো নির্জন কোনো স্থানে। তাদের সর্বশেষ শিকার ছিল দুবাই প্রবাসী সুভাশ চন্দ্র সূত্রধর। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এ তথ্য জানিয়েছে এ চক্রের সদস্য সিএনজি অটোরিকশাচালক নয়ন ও তার সহযোগী ইয়ামিন। সোমবার গভীর রাতে খিলক্ষেত এলাকায় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় একই চক্রের দুই সদস্য এনামুল ও রাসেল । আহত হয়ে গ্রেফতার হয় নয়ন ও ইয়ামিন। ডিবি পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা স্বীকার করেছে, গত ৬ মে দু্বাই যাওয়ার জন্য বগুড়া থেকে ঢাকায় আসেন সুভাষ চন্দ্র সূত্রধর। উত্তরার আব্দুল্লাহপুর নামার পর তারা তাকে যাত্রী হিসেবে সিএনজি অটোরিকশায় তোলে। পরে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেওয়ার সময় সুভাষ চন্দ্র সূত্রধর জোরাজুরি করেন। এ অবস্থায় এনামুল ও রাসেল গলায় গামছা পেঁচিয়ে সুভাষ সূত্রধরকে হত্যা শেষে লাশ ফেলে রাখে খিলক্ষেত ফ্লাইওভারে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মশিউর রহমান। তিনি বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানিয়েছে, সোমবার সন্ধ্যায় টঙ্গীর মধুমিতায় একত্রিত হয়ে প্রথমে আব্দুল্লাহপুর খন্দকার পেট্রোল পাম্পে আসে। সেখান থেকে টার্গেট মতো যাত্রী না পেয়ে বিমানবন্দর হয়ে কাওলার দিকে আসতে থাকে। উদ্দেশ্য ছিল রাজধানীর ভেতরের গন্তব্যে যেতে ইচ্ছুক এমন একক ব্যক্তিকে অটোরিকশায় তুলে তার সর্বস্ব ছিনিয়ে নেওয়া। নয়ন ও ইয়ামিন আরো জানায়, মূলত গামছা এবং মলম দিয়েই তারা মানুষের সর্বস্ব কেড়ে নেয়। ভুক্তভোগী যাত্রী জোরাজুরি করলে তাকে ফাঁস দিয়ে হত্যা করে তারা ফেলে দিত। পুলিশ বা কোনো সন্ত্রাসী গ্রুপের দ্বারা আক্রান্ত হলে নিজেদেরকে রক্ষা করার জন্যই তারা আগ্নেয়াস্ত্র এবং ছুরি বহন করত। তারাসহ নিহত আসামিরা ছিনতাই, ডাকাতি, হত্যা ও মাদকের একাধিক মামলার আসামি বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানায়। তবে তারা সবাই ইয়াবা ও গাঁজায় আসক্ত। যেভাবে গ্রেফতার: ডিবির উপ-কমিশনার মশিউর রহমান বলেন, গভীর রাতে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় কয়েকটি ডাকাত চক্র রাইড শেয়ারের নামে মানুষের সর্বস্ব ডাকাতি করে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছিল। গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তিগত উপাত্তের ভিত্তিতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা গুলশান বিভাগের একাধিক টিম কুড়িল-বিশ্বরোড ফ্লাইওভার, খিলক্ষেত, কাওলা, ঢাকা-ময়মনসিংহ রোড ও পূর্বাচলগামী ৩০০ ফুট সড়কে টহল জোরদার করে। তারই ধারাবাহিকতায় সোমবার রাত সোয়া ২টার দিকে একটি অটোরিকশাকে চেকপোস্টে থামাতে ইশারা দিলে সেটি দ্রুতবেগে ৩০০ ফুট ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে পূর্বাচলের দিকে পালিয়ে যাচ্ছিল। ডিবি পুলিশের দলটি ব্রিজের মাঝে থাকা দ্বিতীয় দলকে ওয়্যারলেসে সতর্ক করলে তারা মাইক্রোবাস আড়াআড়ি দাঁড় করিয়ে পথরোধ করে এবং প্রথম দলটি পেছন থেকে ধাওয়া করে। কিছুক্ষণ পরে অটোরিকশা থেকে দুই সন্ত্রাসী নেমে দৌড়ে সামনে যেতে থাকে এবং পুলিশের মাইক্রোবাস লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে ডিবি পুলিশের একটি মাইক্রোবাসের কাচ ভেঙে যায়। আত্মরক্ষার্থে আক্রান্ত মাইক্রোবাস থেকে ডিবি পুলিশও পালটা গুলি চালায়। গোলাগুলি থেমে গেলে সবুজ রঙের একটি অটোরিকশা (ঢাকা মেট্রো থ : ১১-৭৯৪৫) ফ্লাইওভারের সঙ্গে ধাক্কা খাওয়া অবস্থায় পাওয়া যায়। ঐ অটোরিকশা থেকে নয়ন ও ইয়ামিনকে আটক করা হয়। কিছু দূরে এনামুল ও রাসেল রক্তাক্ত অবস্থায় ফ্লাইওভারের ওপর পড়ে থাকতে দেখা যায়। খিলক্ষেত থানা পুলিশের মাধ্যমে তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠালে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। তাদের পরিচয় নিশ্চিত করে গ্রেফতারকৃত নয়ন ও ইয়ামিন। ডিবির এ কর্মকর্তা আরো জানান, ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ একটি সিএনজি অটোরিকশা, একটি বিদেশি পিস্তল, দুই রাউন্ড গুলিভর্তি একটি ম্যাগাজিন, কাঠের বাঁটযুক্ত একটি পুরনো ধারালো ছুরি, দুই কৌটা টাইগার বাম, একটি সবুজ রঙের গামছা, নয়টি মোবাইল ফোনসেট, ১৬ পিস ইয়াবা, একটি লাইটার এবং ৫ হাজার টাকা উদ্ধার করে।
Link copied!