বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ৯ ফাল্গুন ১৪৩০

কারখানার বর্জ্যে দূষিত শীতলক্ষ্যার পানি

প্রকাশিত: ০৫:২০ এএম, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২১

কারখানার বর্জ্যে দূষিত শীতলক্ষ্যার পানি

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানে ভ্রমণের অন্যতম পথ ছিল নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর। এই নদীকে ঘিরে গোড়াপত্তন হয়েছিল নারায়ণগঞ্জ নগরীর। এক সময় দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ী জাহাজে খাবারের পানি নেওয়া হতো এই নদী থেকেই। আশপাশের শত গ্রামের মানুষের কাছেও পান করার উপযোগী ছিল এই নদীর পানি। সেই শীতলক্ষ্যা নদী এখন মরতে বসেছে দূষণ আর দখলের কবলে। এক কালের সুপেয় পানি যেন এখন অনেকটাই বিষ। এখনও এই নদীর ওপর নির্ভর করে আছে কয়েক লাখ মানুষ। কিন্তু সেই স্বচ্ছ সলিলা স্রোতস্বিনী নদীর পানি এখন ভরা বর্ষায় কিছুটা পরিষ্কার থাকলেও বছরের বাকি সময়ে কালচে আর পুতিগন্ধময়। সুস্বাদু মাছ এখন শুধুই অতীত রোমন্থন। স্থানীয়দের অভিযোগ, শীতলক্ষ্যার তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা কারখানার বর্জ্য নদী দূষণের প্রধান কারণ। নদীর পানি এখন এতটাই দূষিত যে, সেখানে জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব এখন মারাত্মক সংকটে। সরেজমিন দেখা গেছে, এবারের শীত মৌসুমেও শীতলক্ষ্যার পানির কালো রং আরও বেশি প্রগাঢ় হয়ে অনেকটা আলকাতরার রূপ নিয়েছে। বেড়েছে উৎকট গন্ধ আর ফেনিল ঢেউ। নারায়ণগঞ্জ সেন্ট্রাল খেয়াঘাট থেকে একটু উত্তরে গেলে চোখে পড়বে একের পর এক ড্রেনের মুখ-যেগুলো শহর ও শহরতলীর ড্রেনগুলোর সঙ্গে যুক্ত। শহরের খানপুর বরফকল মাঠ এলাকায় গিয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। সন্ধ্যার পর পাঁচটি মোটা পাইপের মাধ্যমে বিভিন্ন ডাইংয়ের দূষিত পানি নদীতে গিয়ে পড়ে। কারণ ডাইং কারখানাগুলো বর্জ্য ও দূষিত পানি ছেড়ে দেয়। এ ছাড়া অনেক ডাইং কারখানা বর্জ্য ফেলার পাইপগুলো পানির নিচ দিয়ে নিয়েছে যাতে সেগুলো দৃশ্যমান না হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে শীতলক্ষ্যার দুই পাড়ে দুই হাজারেরও বেশি শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে। আর এর মধ্যে তরল বর্জ্যে নির্গমনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে পাঁচ শতাধিক। এর মধ্যে শিল্প-কারখানাগুলোতে বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) রয়েছে ৪০৭টি প্রতিষ্ঠানের। এর মধ্যে ব্যবহার করছে ৩০১টি প্রতিষ্ঠান। একদিকে দূষণ আর অন্যদিকে দখলের কবলে প্রতিনিয়ত তার জৌলুস হারিয়েছে এ নদী। নদীর দুই পাশ ডকইয়ার্ড, গোডাউন, কারখানাসহ বিভিন্ন স্থাপনার দখলে ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। শীতলক্ষ্যা নদীর বেশ কয়েকটি জায়গায় দেখা গেল, নোংরা কালো রঙের পানিতে গোসল করছেন লোকজন। কেউ কেউ কাপড় ধোয়ার কাজটিও সারেন এই পানিতেই। ফলে চুলকানি রোগটি এখানে স্বাভাবিক। এলাকার প্রবীণরা বলেন, এক সময় রোগ হলে শীতলক্ষ্যায় গোসল করাইত। আর এখন এই পানিতে গোসল করলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হইব। আগে এ নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন অনেকে। কিন্তু ১৫-২০ বছর ধরে কেউই নদীতে মাছ ধরে না। নদীর যে অবস্থা তাতে মাছ থাকা অসম্ভব। এদিকে জীবিকার তাগিদে কর্মজীবীরা প্রতিদিন দু’বেলা নদী পার হতে বাধ্য হন। দুর্গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসে। নাকে-মুখে কাপড় চেপে তারা চলাচল করেন। পরিবেশ আন্দোলন ও নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সভাপতি এবি সিদ্দিক জানান, বর্জ্য ও দখলের শিকার হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে শীতলক্ষ্যা। নদী রক্ষা আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবে শীতলক্ষ্যা এখন অস্তিত্ব সংকটে। নদীর দু’পাড় দখল করে নদীকে লম্বা খাল বানিয়ে দিচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মো. মঈনুল হক জানান, শীতলক্ষ্যা দূষণের অন্যতম কারণ শিল্প-কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য ও ক্যামিকেলের পানি। সব শিল্প-কারখানায় ইটিপি নেই। যে সব প্রতিষ্ঠানে রয়েছে তার অধিকাংশই ব্যবহার করে না। মোবাইল কোর্টের জন্য আমাদের নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেট নেই। ঢাকা থেকে ম্যাজিস্ট্রেট এলে তখন ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা হয়। নদী রক্ষায় বিভিন্ন অধিদপ্তরকে এগিয়ে আসতে হবে।
Link copied!