বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

রাজধানী ঢাকার আকাশে উড়ন্ত বিমানের ওপর বজ্রপাতের আঘাত

ডেইলি খবর ডেস্ক

প্রকাশিত: জুন ৯, ২০২৬, ১০:১৭ এএম

রাজধানী ঢাকার আকাশে উড়ন্ত বিমানের ওপর বজ্রপাতের আঘাত

ডেইলি খবর ডেস্ক: বাংলাদেশের শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আশপাশের আকাশে ঘন কালো মেঘের ঘনঘটায় একের পর এক ঘটছে বজ্রপাতের ঘটনা। তবে এতে মানুষ হতাহত না হলেও বজ্রপাতের আঘাত পড়েছে উড়োজাহাজের ওপর। আর এটি ঘটেছে ধারাবাহিকভাবে। এতে করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সসহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিদেশি এয়ারলাইন্সও। বজ্রপাতের আঘাতের কারণে গত ১৫ দিনে তিনটি উড়োজাহাজ গ্রাউন্ডেড হয়েছে। আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত সংশ্লিষ্ট উড়োজাহাজের মেরামত খরচ, যন্ত্রাংশ আমদানি এবং আন্তর্জাতিক রুটে বিমান বসে থাকার ক্ষতি হিসেবে বিমান সংস্থাগুলোকে কয়েক লাখ ডলার লোকসানের ঘানি টানতে হচ্ছে।এদিকে শাহজালাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বজ্রপাত থেকে উড়োজাহাজ রক্ষায় বৈরী আবহাওয়ার এই দিনগুলোতে পাইলটদের সতর্কতার সঙ্গে রাডার পর্যবেক্ষণ করে বজ্রপাতপ্রবণ মেঘ এড়িয়ে চলার জন্য বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, দেশের আকাশসীমায় বজ্রপাতের কবলে পড়ে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটের অন্তত তিনটি অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সর্বশেষ এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে ইজিপ্ট এয়ারের একটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার বিমান। একের পর এক বিমান এভাবে আকস্মিক দুর্ঘটনার শিকার হওয়ায় এবং সেগুলো ‘এওজি’ (এয়ারক্রাফট অন গ্রাউন্ড) বা উড্ডয়নের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক শিডিউল বিপর্যয়ের পাশাপাশি বিমানগুলো মেরামতে সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থাগুলোর লাখ লাখ ডলারের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বেসামরকি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদস্য এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট (এটিএম) এয়ার কমোডর নূর-ই-আলম বলেন, বিমানবন্দরের চারপাশে বজ্রপাত প্রতিরোধ ব্যবস্থা করা রয়েছে। বিমান রানওয়ে কিংবা বে সর্বোপরি বিমানবন্দরে ল্যান্ডিং অবস্থায় বজ্রপাতে কোনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। এটি ঘটেছে আকাশ থেকে অবতরণের সময়।
জানা যায়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট বিজি ৭৮৭-৮ অবতরণের সময় হঠাৎই বজ্রপাত আঘাত হানে। এতে করে বিমানটির ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে মেরামত করে ৬ জুন চলাচলের উপযোগী করা হয়। এরপর ২৬ মে রাতে আরেকটি বজ্রপাত বিজি ৭৮৭-৮-এর আরেকটি ফ্লাইটে আঘাত আসে। প্রায় ১৫ দিন চেষ্টা করে ৩ লাখ ডলার ব্যয়ে ফ্লাইটটি মেরামত করে চলাচলের উপযোগী করা হয়। সর্বশেষ রবিবার (৭ জুন) বজ্রপাত আঘাত হানে ইজিপ্ট এয়ারের একটি ফ্লাইটে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কালবৈশাখী ও বর্ষা মৌসুমের এই সময়ে আকাশে মেঘের পারস্পরিক ঘর্ষণের ফলে বিপুল পরিমাণ স্থির তড়িৎ বা বৈদ্যুতিক চার্জের সৃষ্টি হয়। বিমান যখন এই তীব্র চার্জযুক্ত মেঘের মধ্য দিয়ে উড্ডয়ন বা অবতরণ করে, তখন এটি নিজেই একটি শক্তিশালী পরিবাহী হিসেবে কাজ করে। সাধারণত বজ্রপাতের বিদ্যুৎ বিমানের যেকোনো একটি প্রান্ত, যেমন ডানার অগ্রভাগ বা নাকের অংশ দিয়ে প্রবেশ করে পুরো বডির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে অন্য কোনো প্রান্ত বা লেজ দিয়ে বের হয়ে যায়। সম্প্রতি আক্রান্ত হওয়া ইজিপ্ট এয়ারের বোয়িং ৭৮৭-৯ বিমানের গায়ে প্রাপ্ত ক্ষতচিহ্নগুলো বিশ্লেষণ করে এভিয়েশন ইঞ্জিনিয়াররা জানিয়েছেন, এগুলো মূলত বজ্রপাতের প্রবেশ পথ অথবা বহির্গমন পথ। তীব্র বিদ্যুৎ প্রবাহের কারণে বিমানের বডিতে কালো দাগ এবং ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।
জানা যায়, প্রথাগত বা পুরনো মডেলের বিমানগুলোর বডি মূলত অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি হতো, যা খুব সহজে বিদ্যুৎ পরিবহন করে পুরো কাঠামোকে সুরক্ষিত রাখতে পারত। কিন্তু বর্তমান সময়ের অত্যন্ত আধুনিক বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বিমানগুলোর ক্ষেত্রে এই সমীকরণটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই বিমানের ফিউজেলেজ বা মূল বডির প্রায় ৫০ শতাংশ তৈরি হয়েছে অত্যাধুনিক কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল বা কার্বন ফাইবার রিইনফোর্সড প্লাস্টিক দিয়ে। কার্বন ফাইবার ওজনের দিক থেকে অ্যালুমিনিয়ামের চেয়ে অনেক হালকা এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী হলেও, এটি বিদ্যুৎ পরিবহনে অ্যালুমিনিয়ামের মতো দক্ষ নয়। ফলে বজ্রপাতের বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রবাহে যখন এই উপাদানে উচ্চ রেজিস্ট্যান্স বা বাধার সৃষ্টি হয়, তখন বিদ্যুৎশক্তি মুহূর্তের মধ্যে প্রচণ্ড তাপশক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এই চরম তাপমাত্রার প্রভাবেই মূলত কম্পোজিট ম্যাটেরিয়ালটি পুড়ে যায়, গলে যায় কিংবা ফেটে যায়, যাকে কারিগরি ভাষায় ‘ডিল্যামিনেশন’ বলা হয়। যদিও বোয়িং ৭৮৭-এর বডির আবরণের নিচে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম তামার জাল দেওয়া থাকে, যা বিদ্যুৎ প্রবাহকে নিরাপদে বাইরে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে। তবে বজ্রপাতের তীব্রতা মাত্রাতিরিক্ত হলে সেই তামার জালও গলে যায় এবং বিমানের স্কিনে গভীর গর্ত তৈরি করে।
ক্ষতিগ্রস্ত বিমানটি পরীক্ষা করার সময় প্রকৌশলীরা মূলত দুই ধরনের বড় ক্ষতি শনাক্ত করেছেন। প্রথমত উচ্চ বৈদ্যুতিক ভোল্টেজের তাপমাত্রায় বিমানের বডির মেটাল বা কম্পোজিট স্কিন পুড়ে কালো হয়ে গেছে এবং বিভিন্ন স্থানে ছোট ও মাঝারি আকারের গভীর গর্ত বা স্পট তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত বিমানের নীল ও সাদা রঙের বডির সংযোগস্থলে তীব্র তাপে বডির ওপরের স্তর ফেটে বা চটে গেছে। কম্পোজিট বডির ভেতরের লেয়ারগুলো যখন তাপের কারণে একে অপরের থেকে আলাদা বা ডিল্যামিনেশন হয়ে যায়, তখন বিমানের কাঠামোগত শক্তি মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়, যা উড্ডয়ন সুরক্ষাকে সম্পূর্ণ প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।
এভিয়েশন নিরাপত্তায় কোনো প্রকার ঝুঁকি না নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়াররা বিমানটিকে তাৎক্ষণিকভাবে ‘এওজি’ ঘোষণা করে উড্ডয়ন সাময়িকভাবে স্থগিত করেন। ইঞ্জিনিয়াররা জানিয়েছেন, বিমান যখন উচ্চ আকাশে ওড়ে, তখন কেবিনের ভেতরের বাতাসকে সংকুচিত বা প্রেসারাইজড রাখা হয়। বডিতে যদি এ ধরনের ক্ষুদ্র ফাটল বা গর্ত থাকে, তবে আকাশে তীব্র বাতাসের চাপে ওই অংশটি পুরোপুরি ভেঙে বা ফেটে গিয়ে কেবিন ডি-প্রেসারাইজেশনের মতো বড়সড় ও ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ ছাড়া বাইরে থেকে ক্ষতি সাধারণ মনে হলেও, বজ্রপাতের বৈদ্যুতিক তরঙ্গের কারণে বিমানের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ ওয়্যারিং, এভিয়েনিক্স বা ইলেকট্রনিক্স বোর্ড এবং ফুয়েল সিস্টেমের মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা খালি চোখে দেখা যায় না।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ম্যাটেরিয়াল ম্যানেজমেন্টের পরিচালক এয়ার কমোডর মঞ্জুর-ই-আলম বলেন, বিমানের ভেতরেই বজ্রপাত প্রতিরোধের ব্যবস্থা থাকে। এ ছাড়াও বজ্রপাত আঘাত করলে কী করতে হবে সে ইন্সট্রাক্শন পাইলটদের দেওয়া থাকে। বিমানবন্দরের অনগ্রাউন্ড বজ্রপাতের আঘাত আসে না। কারণ এর চারদিকেই বজ্রপাত প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকে।তিনি বলেন, যখন আকাশে এ ধরনের বজ্রপাত হয় বা আঘাত করে তখন করার কিছু থাকে না। পাইলট প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। বজ্রপাত বিমানে আঘাত করলে বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, কম্পোজিট ম্যাটেরিয়ালের এই ক্ষতি সাধারণ কোনো উপায়ে মেরামত সম্ভব নয়। এর জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল ‘নন-ডেস্ট্রাকটিভ টেস্টিং’ বা আল্ট্রাসনিক এক্স-রে পরীক্ষা করতে হবে। এই পরীক্ষার মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া যাবে ক্ষতি ঠিক কতটা গভীরে পৌঁছেছে। এরপর বিমান প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বোয়িং-এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে তাদের নির্দিষ্ট স্ট্রাকচারাল রিপেয়ার ম্যানুয়াল কঠোরভাবে অনুসরণ করে এটি মেরামত করতে হবে, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ।
বিমানের সাবেক প্রকৌশলী আবু সুফিয়ান বলেন, উড়োজাহাজে বজ্রপাতের ক্ষতি কমানো বা এই সমস্যা সমাধানের জন্য এভিয়েশন প্রযুক্তিতে বেশ কিছু কার্যকর সমাধান এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের মতো আধুনিক বিমানের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তিগুলোর উন্নয়ন ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।
তিনি বলেন, লাইটনিং প্রোটেকশন সিস্টেম আধুনিক কম্পোজিট (কার্বন ফাইবার) বিমানের বডি সরাসরি বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে না। তাই এর ভেতরের অংশকে সুরক্ষিত রাখতে বিমানের পুরো বডির ওপরের চামড়া বা স্কিনের ঠিক নিচে একটি অত্যন্ত পাতলা এবং সূক্ষ্ম ধাতব জাল বিছিয়ে দেওয়া হয়। একে কপার বা অ্যালুমিনিয়াম মেশ বলা হয়। বজ্রপাত হলে এই ধাতব জালটি বিদ্যুৎকে বিমানের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশে (যেমন ফুয়েল ট্যাংক বা কম্পিউটার) ঢুকতে না দিয়ে, বডির ওপর দিয়ে ভাসিয়ে লেজ বা ডানার প্রান্ত দিয়ে বের করে দেয়। এটিকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘ফ্যারাডে কেজ’ ইফেক্ট বলা হয়।তিনি বলেন, বজ্রপাত পুরোপুরি ঠেকানো অসম্ভব হলেও আধুনিক ধাতব জালের আবরণ, উন্নত ওয়েদার রাডার এবং ডিজিটাল সেন্সর প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই উড়োজাহাজকে বজ্রপাতের হাত থেকে নিরাপদ রাখা সম্ভব। সুত্র-আমাদের সময়,সংগৃহীত ছবি

 

 

 

 

ডেইলি খবর টুয়েন্টিফোর

Link copied!